বাংলার উনিশ ও বিশ শতকের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ভারতীয় আধুনিকতার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুভাষচন্দ্র বসু এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়—এই ব্যক্তিত্বদের একই রাজনৈতিক বা দার্শনিক ধারার মানুষ হিসেবে দেখা যায় না। তাঁদের মধ্যে ধর্মীয় সংস্কারবাদী, সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক জাতীয়তাবাদী, মানবতাবাদী, সন্ন্যাসী-চিন্তক, বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী এবং সাংগঠনিক হিন্দু রাজনীতির প্রতিনিধি—বিভিন্ন প্রবণতা পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। সেই কারণেই বাংলার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার প্রশ্নটি বিশেষভাবে জটিল। এখানে প্রশ্নটি শুধু কে কাকে সম্মান করছে তা নয়; বরং কোন ব্যক্তিত্বের কোন দিকটি স্মরণ করা হচ্ছে, কোন দিকটি রাজনৈতিকভাবে সামনে আনা হচ্ছে এবং কোন দিকটি অপেক্ষাকৃত আড়ালে চলে যাচ্ছে।এই দৃষ্টিকোণ থেকে সমসাময়িক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কথাবার্তাকে বিশ্লেষণ করলে ‘প্রত্যাখ্যান’-এর তুলনায় ‘নির্বাচিত আত্মসাৎ’ এবং ‘ঐতিহাসিক পুনর্ব্যাখ্যা’ ধারণা বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। অর্থাৎ বাংলার মনীষীদের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান না করে তাঁদের এমন একটি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী এবং সভ্যতাগত বংশপরম্পরার মধ্যে স্থাপন করা হচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দু ভারতীয় সভ্যতার হিন্দু সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা। এই প্রক্রিয়ায় বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব বিশেষ গুরুত্ব পান; অন্যদিকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ বা নেতাজির চিন্তার যে অংশগুলি যুক্তিবাদ, সমাজসংস্কার, ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ অথবা জাতীয়তাবাদের সমালোচনার সঙ্গে যুক্ত, সেগুলি কখনও কখনও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি করে।এই প্রবণতার একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালের রাজনৈতিক কৌশলে। সেই সময়ের একটি সংবাদপ্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিজেপির নীতিনির্ধারণী পরিসরের সঙ্গে যুক্ত শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গবেষণা ফাউন্ডেশন বাংলার ‘ভুলে যাওয়া বাঙালি মনীষীদের’ জনস্মৃতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এবং একটি বিকল্প বয়ান নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখকে এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগের কেন্দ্রে রাখা হয়। প্রতিবেদনে বাঙালি পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার কথাও বলা হয়েছিল।এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে সাংস্কৃতিক স্মৃতি এখানে শুধু অতীতচর্চার বিষয় নয়। একটি রাজনৈতিক দল যখন বাংলায় নিজেকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখার প্রবণতার মোকাবিলা করতে চায়, তখন বাঙালি মনীষীদের পুনরায় সামনে আনা একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কৌশল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র বা বিবেকানন্দকে স্মরণ করার প্রশ্নটি শুধু তাঁদের সাহিত্য বা দর্শনের মূল্যায়ন নয়; তাঁরা সমসাময়িক বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে কী অর্থ বহন করবেন, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই অর্থে সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ বলতে কোনো ব্যক্তিত্বকে ইতিহাস থেকে ‘চুরি’ করা বোঝায় না; বরং তাঁর উত্তরাধিকারকে একটি নতুন মতাদর্শিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা বোঝায়।এই প্রক্রিয়ার মতাদর্শিক পরিকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গবেষণা ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের নিজস্ব পরিচিতিতে বলা হয়েছে যে তাদের কাজ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জাতীয়তাবাদী চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সমকালীন সমস্যাগুলিকে ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। সুতরাং তাদের সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সাহিত্যিক বা ঐতিহাসিক সংকলন হিসেবে না দেখে একটি নির্দিষ্ট জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধিক প্রকল্প হিসেবেও পড়া যায়।এই কাঠামোর মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য ও চিন্তার পরিসর ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। তিনি ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, ধর্ম, নৈতিকতা, সমাজ, জাতীয়তা এবং হিন্দু সাংস্কৃতিক চেতনার নানা প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু সমসাময়িক রাজনৈতিক আত্মসাতে তাঁর নাম বিশেষভাবে ‘বন্দে মাতরম্’ এবং জাতীয়তাবাদী কল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে বঙ্কিমের সম্পূর্ণ বৌদ্ধিক জটিলতার পরিবর্তে তাঁর নির্দিষ্ট জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু সাংস্কৃতিক প্রতীকী দিকগুলি রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। এটিই নির্বাচিত আত্মসাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ: ব্যক্তিত্বটি একই থাকেন, কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারের একটি বিশেষ অংশ রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে।স্বামী বিবেকানন্দের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। তাঁর বক্তব্যে হিন্দু সভ্যতার আত্মমর্যাদা, বেদান্ত এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের শক্তিশালী উপাদান ছিল। সেই কারণে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কথাবার্তায় তাঁর গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু তাঁর চিন্তায় মানবসেবা, দরিদ্রের উন্নয়ন, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং মানবজাতির বৃহত্তর ঐক্যের কথাও ছিল। ফলে বিবেকানন্দকে কেবল হিন্দু আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করলে তাঁর চিন্তার একটি বিশেষ অংশ সামনে আসে, অন্য অংশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে যায়। ২০১৮ সালের সাংস্কৃতিক উদ্যোগে বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দের বিশেষ গুরুত্ব এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াটিকে বোঝার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।রামমোহন রায়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও তীব্র হয়ে ওঠে, কারণ তাঁর উত্তরাধিকারের কেন্দ্রে রয়েছে সমাজসংস্কার এবং যুক্তিবাদী ধর্মসমালোচনা। ১৮১৮ সালে তিনি সতীদাহের ধর্মীয় বৈধতার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে ‘জীবন্ত বিধবাদের দাহ করার প্রথার সমর্থক ও বিরোধীর মধ্যে কথোপকথন’ প্রকাশ করেন। প্রাথমিক উৎসে তাঁকে সতীদাহের পক্ষে ব্যবহৃত ধর্মীয় যুক্তির সমালোচক হিসেবে দেখা যায়।পরবর্তী গবেষণাতেও তাঁর আন্দোলনকে একটি ধারাবাহিক সমাজসংস্কার কর্মসূচি হিসেবে দেখা হয়েছে। মীনাক্ষী জৈন রামমোহনকে সতীদাহের দৃঢ় বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং ১৮১৮, ১৮২০ ও ১৮২১ সালের বিভিন্ন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। জওহর সরকারও রামমোহনের যুক্তিবাদ, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, নারীর অধিকার এবং সতীদাহবিরোধী অবস্থানকে তাঁর বৌদ্ধিক প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।এই ঐতিহাসিক রেকর্ডের বিপরীতে ২০২৫ সালে বিজেপি নেতা এবং মধ্যপ্রদেশের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ইন্দর সিং পারমার রামমোহনকে ‘ব্রিটিশ এজেন্ট’ এবং ব্রিটিশদের ‘দালাল’ বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, ব্রিটিশরা ‘ভুয়ো সমাজসংস্কারক’ তৈরি করেছিল এবং রামমোহন সেই ধারার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।এই বক্তব্যকে তাই ঐতিহাসিক পুনর্ব্যাখ্যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। কারণ এখানে রামমোহনের সমাজসংস্কারমূলক কাজকে শুধু প্রশ্ন করা হয়নি; তাঁর কাজের ঐতিহাসিক অর্থই পাল্টে দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি ঔপনিবেশিক বাংলায় সতীদাহবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁকে ঔপনিবেশিক স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই বক্তব্যকে বিজেপির সরকারি মতাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো প্রমাণ নেই। ওই মন্তব্যের পর মধ্যপ্রদেশ বিজেপি বক্তব্যটি থেকে দূরত্ব তৈরি করে এবং সেটিকে পারমারের ব্যক্তিগত মত বলে উল্লেখ করে। পরে পারমার নিজেও ক্ষমা চান।এই পাল্টা তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গবেষণার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয় কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত তৈরি করা। বরং দেখতে হবে কোন ধরনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা কখন এবং কীভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। পারমারের বক্তব্য ব্যক্তিগত মন্তব্য হতে পারে; কিন্তু একই সঙ্গে এটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক পুনর্ব্যাখ্যার প্রবণতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় গবেষণার উপাদানও বটে।রামমোহনের বিরোধিতার আরেকটি ঐতিহাসিক দিক এখানে প্রাসঙ্গিক। তনিকা সরকার দেখিয়েছেন যে উনিশ শতকের গোড়ায় রামমোহনের সতীদাহবিরোধী অবস্থানকে শুধু নারীর প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়নি; প্রথাগত সমাজের কাছে এটি জাতপাত, বংশমর্যাদা এবং ধর্মীয় রীতির বিরুদ্ধেও আঘাত ছিল। তাঁকে আক্রমণ করে প্রচারিত ছড়ায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জাতপাতের ব্যবস্থা নষ্ট করার অভিযোগও ছিল।অর্থাৎ রামমোহনের ক্ষেত্রে সমাজসংস্কার নিজেই ছিল সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের পুনর্বিন্যাসের একটি প্রকল্প। আজ তাঁর বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক এজেন্ট হওয়ার অভিযোগ তোলা হলে সেই পুরনো সংঘাতের একটি নতুন রাজনৈতিক রূপ দেখা যায়। সমাজসংস্কারমূলক আধুনিকতাকে দেশীয় নবজাগরণের অংশ হিসেবে না দেখে ঔপনিবেশিক দূষণ বা ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনা তৈরি হয়।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিধবা-বিবাহ আন্দোলনে বিদ্যাসাগর একদিকে হিন্দু শাস্ত্রের অভ্যন্তর থেকে সংস্কারের যুক্তি তৈরি করেছিলেন, অন্যদিকে প্রচলিত সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৮৫৫ সালে তাঁর বিধবা-বিবাহ বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং ৪ অক্টোবর প্রায় এক হাজার মানুষের স্বাক্ষরসহ বিধবা-বিবাহের পক্ষে আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়। সেই আবেদনপত্রে বিধবা-বিবাহ নিষিদ্ধ করার প্রথাকে নিষ্ঠুর ও অপ্রাকৃতিক বলে চিহ্নিত করা হয় এবং তাকে নৈতিকতা ও সমাজকল্যাণের বিরোধী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।এই বিদ্যাসাগরকে সমসাময়িক বাংলার রাজনীতিতে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়নি; বরং তাঁর স্মৃতি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়েছে। ২০১৯ সালে বিদ্যাসাগর কলেজে তাঁর মূর্তি ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস পরস্পরকে দোষারোপ করেছিল। ঘটনাটি কে ঘটিয়েছিল তা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ ছিল এবং একে সরাসরি কোনো একটি দলের পরিকল্পিত কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো সর্বসম্মত প্রমাণ নেই। কিন্তু ঘটনাটি নিশ্চিতভাবে দেখিয়েছিল যে বিদ্যাসাগরের স্মৃতি নির্বাচনী ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিদ্যাসাগরকে ‘হিন্দু ঐতিহ্যের মানুষ’ হিসেবে স্মরণ করা এবং তাঁর বিধবা-বিবাহ আন্দোলনকে তাঁর উত্তরাধিকারের কেন্দ্রে রাখা এক বিষয় নয়। প্রথমটি সাংস্কৃতিক প্রতীক; দ্বিতীয়টি সমাজসংস্কারের ইতিহাস। একই ব্যক্তিকে দুই ভিন্ন মতাদর্শিক বংশপরম্পরায় স্থাপন করা সম্ভব। এই দ্বৈততাই নির্বাচিত আত্মসাৎ বোঝার অন্যতম চাবিকাঠি।রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। তাঁকে বাদ দিয়ে আধুনিক ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস লেখা অসম্ভব। ফলে কোনো বৃহৎ জাতীয় সাংস্কৃতিক বয়ানই তাঁকে উপেক্ষা করতে পারে না। সমসাময়িক বিজেপির বক্তব্যেও রবীন্দ্রনাথ বারবার উপস্থিত। ২০২০ সালে অমিত শাহ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা পুনরুজ্জীবনের কথা বলেন এবং রামমোহন, বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখকে বাংলার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে একই বৃহত্তর জাতীয় কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেন।কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নিজের জাতীয়তাবাদ-সমালোচনা এই আত্মসাৎকে জটিল করে তোলে। ১৯১৭ সালের ‘ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া’-তে তিনি ভারতীয় সমস্যাকে মূলত সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখেছিলেন এবং জাতীয়তাবাদকে ভারতের সমস্যাগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে সমালোচনা করেছিলেন।তাই রবীন্দ্রনাথকে দেশপ্রেমিক বা জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা এবং তাঁর জাতীয়তাবাদ-সমালোচনাকে গ্রহণ করা একই বিষয় নয়। যদি তাঁর সাংস্কৃতিক প্রতীক, গান, কবিতা এবং বাঙালি পরিচয়ের উপাদান গ্রহণ করা হয়, কিন্তু জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিশ্বমানবতা সম্পর্কে তাঁর জটিল দার্শনিক অবস্থান আড়ালে থাকে, তবে সেটি সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথ নয়; সেটি নির্বাচিত রবীন্দ্রনাথ।২০২১ সালে বিজেপির মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়ার একটি মন্তব্যও এই সাংস্কৃতিক দূরত্বের একটি ছোট উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়েছিল। তিনি রবীন্দ্রনাথের পদবি ‘ঠাকুর’ নয়, ‘ট্যাগোর’ বলে সংশোধন করার চেষ্টা করেছিলেন। বিজেপির তৎকালীন বঙ্গ সভাপতি দিলীপ ঘোষ পরে স্বীকার করেছিলেন যে দিল্লির নেতাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বাংলা ও ইংরেজি নাম নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। এই ঘটনাকে বাঙালিবিদ্বেষের প্রমাণ বলা যায় না; তবে এটি দেখায় যে কোনো সংস্কৃতিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করা এবং সেই সংস্কৃতির ভাষিক ও ঐতিহাসিক সূক্ষ্মতা যথাযথভাবে বোঝা এক বিষয় নয়।নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ক্ষেত্রেও একই দ্বৈততা রয়েছে। সমসাময়িক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে তাঁর সামরিক সাহস, আত্মত্যাগ, ঔপনিবেশিক-বিরোধী জাতীয়তাবাদ এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ সহজেই রাজনৈতিক সমাবেশের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদির সরকারি বক্তব্যে নেতাজিকে জাতীয় আত্মমর্যাদা, সাহস এবং সামরিক অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একই বক্তব্যে তাঁকে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও অঞ্চলের মানুষকে আজাদ হিন্দ ফৌজে সংগঠিত করার জন্যও প্রশংসা করা হয়।কিন্তু নেতাজির রাজনৈতিক চিন্তার ধর্মনিরপেক্ষ এবং বহুত্ববাদী দিকও ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২৮ সালের একটি বক্তব্যে তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক নৈকট্যের কথা বলেন এবং ধর্মীয় উগ্রতাকে সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার উপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কলকাতা কর্পোরেশনে তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও মুসলমানদের নিয়োগের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল উল্লেখযোগ্য।অতএব নেতাজিকে শুধু সামরিক জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলে তাঁর বহুত্ববাদী রাজনীতি আংশিকভাবে আড়ালে চলে যেতে পারে। আবার তাঁর তীব্র জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করাও ঐতিহাসিকভাবে ভুল হবে। এখানেই ‘নির্বাচিত আত্মসাৎ’ ধারণাটি কার্যকর। একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তাঁর অন্যান্য দিকগুলি রাজনৈতিক বয়ানের জন্য অপেক্ষাকৃত কম কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে।এই সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন ২০২৬ সালের বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইস্তাহারে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সেখানে ‘বাংলার গৌরব’, ‘বাংলার সভ্যতা’ এবং ‘বাঙালি হিন্দু সাংস্কৃতিক পরিচয়’-এর সঙ্গে বন্দে মাতরম্ জাদুঘর, শক্তিপীঠ পরিক্রমা, চৈতন্য মহাপ্রভু আধ্যাত্মিক পরিক্রমা এবং রবীন্দ্রনাথ-প্রেরিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মতো বিভিন্ন প্রকল্প যুক্ত করা হয়েছে।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আগের পর্যায়ে প্রশ্ন ছিল বিজেপি বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না। পরবর্তী পর্যায়ে প্রশ্নটি হয়ে উঠেছে—বাংলার সংস্কৃতির অর্থ কী? যদি বাংলার সভ্যতাকে বৃহত্তর ভারতীয় হিন্দু সভ্যতার কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করা হয়, তবে বাঙালি পরিচয় একটি আঞ্চলিক পরিচয় থাকার পাশাপাশি বৃহত্তর হিন্দু-জাতীয় পরিচয়ের একটি আঞ্চলিক প্রকাশ হিসেবেও নির্মিত হতে পারে।এই পরিবর্তনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইস্তাহার নিয়ে বিশ্লেষণে দেখা হয়েছে যে বিজেপির সাংস্কৃতিক প্রতিশ্রুতিগুলি বাংলাকে বৃহত্তর সর্বভারতীয় সভ্যতাগত কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করছে। বিপরীতে অন্য রাজনৈতিক বয়ান বাংলাকে তুলনামূলকভাবে নিজস্ব ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে উপস্থাপন করছে। এটি কোনো দলের নিজস্ব ঘোষণার ভাষা নয়, বরং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ; কিন্তু সাংস্কৃতিক কাঠামোর পার্থক্য বোঝার জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ।এই পর্যায়ে ‘বাঙালিবিদ্বেষ’ ধারণাটিকে তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। বিজেপি বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করছে—এমন দাবি বর্তমান প্রমাণ সমর্থন করে না। বরং ২০২৬ সালের কৌশলে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক মনীষীদের আরও বেশি সামনে আনার প্রবণতা দেখা যায়। বিজেপির বঙ্গ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যই ছিল নিজেদের ‘বহিরাগত’ পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসা।এখানেই ‘বাঙালিবিদ্বেষ’ এবং ‘বাঙালি পরিচয়ের মতাদর্শিক পুনর্গঠন’—এই দুই ধারণার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। প্রথমটি একটি মানসিকতা বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে শক্তিশালী দাবি; দ্বিতীয়টি একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। বর্তমান প্রমাণ দ্বিতীয় ধারণাটিকে অনেক বেশি শক্তিশালীভাবে সমর্থন করে।এই পুনর্গঠনের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান আলাদা। তিনি নিজেই বাঙালি রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ এবং হিন্দু রাজনৈতিক সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ফলে তাঁকে বাঙালি ঐতিহ্যের মধ্যে বিশেষভাবে সামনে আনা একই সঙ্গে আঞ্চলিক এবং হিন্দু-জাতীয়তাবাদী বংশপরম্পরাকে সংযুক্ত করে। বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদকে একই সাংস্কৃতিক ধারায় স্থাপন করলে বাংলার জাতীয়তাবাদী অতীতকে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক ধারাবাহিকতার মধ্যে পড়া সম্ভব হয়।অন্যদিকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার এই ধারাকে জটিল করে। তাঁরা হিন্দু সমাজের অভ্যন্তর থেকে সংস্কার, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, সামাজিক মুক্তি এবং বিশ্বজনীনতার নানা প্রকল্প তৈরি করেছিলেন। তাঁদের জাতীয়তাবাদ বা সাংস্কৃতিক পরিচয় সরল সংখ্যাগুরু পরিচয়ের সমার্থক ছিল না। ফলে তাঁদের একই বংশপরম্পরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে তাঁদের চিন্তার কিছু অংশকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়।এইখানেই সমসাময়িক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কথাবার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া দেখা যায়। এটি সাধারণত ‘এই ব্যক্তি আমাদের নন’ বলে ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করে না; বরং ‘এই ব্যক্তির প্রকৃত অর্থ ছিল অন্য কিছু’—এই ধরনের পুনর্ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাঁকে নিজের বয়ানের মধ্যে আনার চেষ্টা করতে পারে। রামমোহনের ক্ষেত্রে সমাজসংস্কারমূলক আধুনিকতাকে ঔপনিবেশিক প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনা তৈরি হয়; রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তাঁর বিশ্বজনীনতার পরিবর্তে জাতীয়-সাংস্কৃতিক প্রতীকী গুরুত্ব সামনে আসতে পারে; নেতাজির ক্ষেত্রে বহুত্ববাদী রাজনীতির পরিবর্তে সামরিক দেশপ্রেম অধিক prominent হয়ে উঠতে পারে।তবে এটিকে একমাত্র বিজেপির বৈশিষ্ট্য বলাও সঠিক হবে না। রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিজেদের রাজনৈতিক ভাষায় পুনর্ব্যাখ্যা করে। পার্থক্যটি এখানে পরিসর এবং মতাদর্শিক কাঠামোতে। বিজেপির ক্ষেত্রে বাংলার আঞ্চলিক মনীষীদের বৃহত্তর সর্বভারতীয় সভ্যতাগত বয়ানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। ২০১৮ সালের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এবং ২০২৬ সালের ইস্তাহারের মধ্যে এই ধারাবাহিকতা দেখা যায়।তাই এই আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী গবেষণামূলক সিদ্ধান্ত হতে পারে—সমসাময়িক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কথাবার্তা বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার চেয়ে বেশি করে পুনর্গঠন ও পুনঃপ্রাসঙ্গিকীকরণ করছে। এই পুনর্গঠনে বাংলার ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতাগত এবং জাতীয়তাবাদী বংশপরম্পরায় স্থাপন করা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ায় বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কিছু নির্দিষ্ট মতাদর্শিক দিক বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে; অন্যদিকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ এবং নেতাজির সংস্কারবাদী, যুক্তিবাদী, বহুত্ববাদী বা সংখ্যাগুরু-জাতীয়তাবাদ-বিরোধী মাত্রাগুলি তুলনামূলকভাবে কম কেন্দ্রীয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এটি একটি গবেষণামূলক ব্যাখ্যা, যা ব্যক্তিভিত্তিক ও পাঠভিত্তিক প্রমাণ দিয়ে ক্রমাগত পরীক্ষা করা দরকার।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই বিশ্লেষণকে ‘বিজেপি বাঙালিদের ঘৃণা করে’—এই সরল সিদ্ধান্তে নামিয়ে আনা যাবে না। কারণ একই রাজনৈতিক প্রকল্প একদিকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ এবং নেতাজিকে শ্রদ্ধা জানায়, অন্যদিকে তাঁদের উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়। আবার বাংলা ভাষা, খাদ্যসংস্কৃতি, উৎসব এবং আঞ্চলিক মনীষীদেরও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করে। অর্থাৎ এখানে প্রত্যাখ্যান নয়, অন্তর্ভুক্তি; অদৃশ্য করে দেওয়া নয়, পুনর্ব্যাখ্যা; সাংস্কৃতিক শত্রুতা নয়, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা—এই ধারণাগুলিই বেশি কার্যকর।রামমোহনকে ‘ব্রিটিশ এজেন্ট’ বলা এই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। কারণ এটি দেখায়, কোনো সংস্কারকের ঔপনিবেশিক যুগে কাজ করা এবং ঔপনিবেশিকতার এজেন্ট হওয়া—এই দুই ঐতিহাসিক ধারণাকে কীভাবে রাজনৈতিক ভাষ্যে এক করে দেওয়া যায়। একইভাবে রবীন্দ্রনাথ বা নেতাজির ক্ষেত্রে তাঁদের একটি দিককে জাতীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা এবং তাঁদের সম্পূর্ণ বৌদ্ধিক প্রকল্পকে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়।অতএব বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আসলে ‘কে বাঙালির পক্ষে’—এই সরল প্রশ্নের চেয়ে অনেক গভীর। প্রশ্ন হল—বাঙালি আধুনিকতার উত্তরাধিকারকে কোন ঐতিহাসিক বংশপরম্পরায় বসানো হবে? উনিশ শতকের সংস্কার, যুক্তিবাদ, সামাজিক মুক্তি এবং বহুত্ববাদের ধারায়, নাকি হিন্দু সভ্যতাগত জাতীয়তাবাদের ধারায়, নাকি এই দুইয়ের মধ্যে কোনো নতুন সমন্বয়ে? সমসাময়িক রাজনৈতিক কথাবার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দ্বিতীয় ও তৃতীয় পথের দিকে এগোচ্ছে—এমন একটি গবেষণামূলক অনুমানের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু সেই প্রমাণ থেকে ‘বাঙালিবিদ্বেষ’ বা কোনো একক মানসিক উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে আরও বিস্তৃত প্রাথমিক উৎসের সমীক্ষা প্রয়োজন।সেই কারণে এই বিতর্কের পরবর্তী গবেষণার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হবে ব্যক্তিত্বভিত্তিক নয়, পাঠভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ। রামমোহনের ক্ষেত্রে তাঁর সতীদাহবিরোধী লেখা এবং সমকালীন ও পরবর্তী সমালোচনা; বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে বিধবা-বিবাহ ও শিক্ষাসংস্কার; বঙ্কিমের ক্ষেত্রে ‘বন্দে মাতরম্’ ও ধর্ম-জাতীয়তা; বিবেকানন্দের ক্ষেত্রে হিন্দু পুনর্জাগরণ ও বিশ্বমানবতাবাদ; রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ ও বিশ্বমানবতা; নেতাজির ক্ষেত্রে সামরিক জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদ—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাথমিক লেখার সঙ্গে সমসাময়িক বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের বক্তব্য, প্রকাশনা, ইস্তাহার এবং সাংস্কৃতিক প্রচারের তুলনা করা দরকার। তখন বোঝা যাবে কোন ঐতিহাসিক উপাদান সত্যিই প্রান্তিক করা হচ্ছে, কোনটি কেবল ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে এবং কোনটি একই সঙ্গে গ্রহণ ও পুনর্ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে একটি আরও সূক্ষ্ম ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সম্ভব হয়। সমসাময়িক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কথাবার্তা বাংলার ঐতিহ্যকে ধ্বংস করছে না; বরং তার অর্থ-নির্মাণের কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বাংলার সাংস্কৃতিক পুঁজি—বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, চৈতন্য, বিদ্যাসাগর, রামমোহন—সবই বৃহত্তর জাতীয় বয়ানের মধ্যে স্থান পাচ্ছে। কিন্তু সেই স্থান একই নয়, এবং সেই স্থান নির্ধারণের মধ্যেই সমসাময়িক মতাদর্শিক প্রতিযোগিতার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।