দরগাহ ৪

পীর ঠাকুরবর হলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ইছাপুর-গোবরডাঙা-খাঁটুরা অঞ্চলের চারঘাটের মুসলমান সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট পীর। এই পীর ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসীর বেশে থাকতেন বলে সাধারণ মানুষ তাকে ‘ঠাকুর’ বলত এবং তার বরলাভ করে রোগীরা আরোগ্যলাভ করত বলে তার নাম ‘ঠাকুরবর’ হয়েছে। ইনি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পীর মোবারক বড়খাঁ গাজীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।পীর ঠাকুরবরের আসল নাম কামদেব বন্দ্যোপাধ্যায় (রায়)। তিনি ছিলেন বৃহত্তর যশোর জেলার লাউজানির (প্রাচীন নাম ব্রাহ্মণনগর) হিন্দু ব্রাহ্মণ রাজা মুকুট রায়ের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। ষোড়শ শতাব্দীতে ইসলাম প্রচারক পীর বড়খাঁ গাজীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের পর রাজা মুকুট রায়, তার পুত্র ও কন্যা চম্পাবতী কে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। এই সময় রাজার স্ত্রী বড়খাঁ গাজীর অধিকারে আসেন অর্থাৎ গনিমতের মাল হিসেবে যুদ্ধ বন্দী হন৷মুসলমানরা প্রচার করে রাজার পতনের পর নিরাপত্তার জন্য তার রানী বড়খাঁ গাজীর আশ্রয়ে যানযে কথা ছোট বাচ্চা ও বিশ্বাস করবে না৷শত্রুর কাছে ই নাকি নিরাপত্তা চাইবে কেউ!পরে রানীকে ধর্মান্তরিত করে ও বিয়ে করে ওই গাজী নামের পাজি৷এমন কি রাজার মেয়ে চম্পাবতী কে ও জোর করে গাজী বিয়ে করে।কামদেব ও চম্পাবতী কে গাজী জোর করে তার সাথে তৎকালীন খুলনা জেলার লাবসা গ্রামে নিয়ে যায়,ছেলেকে সম্ভবত দাস বানিয়েছিল এবং রাজা কামদেব কে ও দাস বানিয়েছিল৷অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চম্পাবতী আত্মহত্যা করেন আর কামদেব বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট মহকুমার চারঘাট গ্রামে চলে আসেন। এখানে এসে তিনি সাধনাবলে পীর হয়ে থেকে যান এবং স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে যথাযোগ্য সম্মান অর্জন করেন।কথিত আছে, ইনি বুকে হাড়ি নিয়ে নিকটস্থ যমুনা নদী পার হয়ে চারঘাট গ্রামে উপস্থিত হন মনে হয় পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন,এজন্য তার পারের ঘাটটিকে ‘হেড়ের ঘাট’ বলা হয়। তিনি চারঘাট বাঁওড়ের কাছে এসে একটি কুটির নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। তিনি একটি বাঘ এবং একটি কুমির পুষেছিলেন, যারা গভীর রাতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসত। তিনি ছিলেন বাকসিদ্ধ পুরুষ; যে কোনো ব্যাধিগ্রস্ত রোগীকে তিনি সুস্থ করতে পারতেন। শোনা যায়, তিনি নাকি যশোহরের মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সংস্পর্শেও এসেছিলেন। প্রতাপাদিত্য তার আস্তানায় নিয়মিত আসতেন ও শ্রদ্ধানিবেদন করতেন(এর থেকে বোঝা যায় বাইরে পীর সেজে থাকলে ও কামদেব অন্তরে হিন্দু ই ছিলেন)৷চারঘাটের পাশে কাঁচদহ গ্রামের হরি শুঁড়ি নামক এক ব্যক্তি পীরের কৃপায় খুব উন্নতি হয়ে এখানে এসে বসতি স্থাপন করে। প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হয়ে সে পীরকে উপেক্ষা করতে থাকে; এমনকি, প্রতাপাদিত্যের বিরাগভাজন হাওয়ায় হরি নানা বিপজ্জনক পরিস্থিতে পড়ে। শেষপর্যন্ত পীরের অভিশাপে হরি সপরিবারে যমুনায় প্রাণত্যাগ করে ধ্বংস হয়; সেজন্য, যমুনার এই স্থানকে লোকে আজও ‘হরে শুঁড়ির দহ’ বলে।

পীর ঠাকুরবরের দরগাহ

দরগাহের সেবায়েতরা(মুসলমানদের আবার সেবায়েত কি?সেবায়েত মন্দিরে হয়) বংশপরম্পরায় মুসলিম। তারা প্রতিদিন ধূপ-বাতি জ্বালিয়ে নানা উপচারে শিরনি দিয়ে পীরকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পীরের সমাধিস্তম্ভটি উপবীত-বেষ্টিত ছিল কিছুকাল আগে (১৯৬০-এর দশক) পর্যন্তও(তাহলে ই বুঝুন সবাই)৷ সমাধির পাশে একটি জপমালা রাখা আছে(জপমালা ও হিন্দুদের ই হয়,মুসলমানদের জপমালা হয় না,তসবি হয়)। দরগাহের দুটি ইটের উপর আরবি হরফে খোদিত লিপি আছে, যার পাঠোদ্ধার করা আজও সম্ভব হয়নি(ওদিকের কেউ ওই লেখার ছবি তুলে দিলে উপকৃত হবো)৷ ঠাকুরবরের এই দরগাহে ফুল-বেলপাতা(ফুল না হয় দরগায় দেয় কিন্তু বেলপাতা কবে মুসলমানরা দরগায় দেয়?বেলপাতা তো মহাদেব কে দেওয়া হয়৷) দিয়ে নিত্যপূজার(দরগায় কোন পুজা হয় না,পুজা হিন্দুগের ই রীতি)রীতি প্রচলিত আছে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রত্যেকে বিবাহাদি অনুষ্ঠানের সময় দরগাহে পীরের কাছে আশীর্বাদ চেয়ে নেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *