এই গল্পটা ১৯৫৯ সালের। ১৯ বছর বয়সী এক আমেরিকান মেয়ে, যার নাম ছিল হোপ কুক, ভারতে ঘুরতে এসেছিল। ভারতে এসে সে সরাসরি দার্জিলিং গিয়েছিল। যে হোটেলে সে থাকছিল, সেখানেই সিকিমের যুবরাজ পালডেন থান্ডোপ নামগ্যালে থাকছিলেন। তখন সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতে যুক্ত হয়নি। হোটেলে হোপ কুকের যুবরাজ পালডেনের সাথে দেখা হয় এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা শুরু হয়। মাত্র ৪ বছর পর, ১৯৬৩ সালে দার্জিলিংয়ের এক বৌদ্ধ মঠে সিকিমের ভবিষ্যৎ রাজা পালডেন নামগ্যালে সেই আমেরিকান মেয়ের সাথে বিয়ে করে ফেলেন। যেন কোনো পরীর গল্পের মতো৷(এই ঘটনা দেখে কি মনে হচ্ছে এত সহজ ব্যাপারটা?কেউ একজন অন্য একজনকে দেখে প্রেমে পড়ে গেল তাও আবার অন্য দেশে এসে তাও আবার সেই অ্যামেরিকা থেকে এসে,যে অ্যামেরিকা,সব সময় ভারতের উপর নানা ভাবে বিরক্ত করে,ভারতের সব ব্যাপারে নাক গলায়,কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে,সোজা কথায় ভারতকে তাদের শাষিত দেশ বলে মনে করে সেই অ্যামেরিকার নাগরিক৷মোটেই ব্যাপারটা অত সরল না৷এই মেয়েটিকে অ্যামেরিকার CIA তাদের এজেন্ট হিসেবে,হানি ট্র্যাপ হিসেবে পাঠিয়েছিল সিকিমের উপর কতৃত্ব নেওয়ার জন্য৷সেই সময় ও সিকিমে রাজতন্ত্র চলছিল তাই রাজপুত্রকে কব্জা করলে তার মাধ্যমে যা ইচ্ছা হবে সেটাই করিয়ে নিতে পারবে৷তাই তাকে টার্টেগ করে পাঠানো হয়েছিল৷ঘটনা দেখে বোঝা যায় ব্যাপারটা এইটুকুতে ও সীমাবদ্ধ ছিলনা৷যুবরাজ পালডেন থান্ডোপ নামগ্যালেকেও আগে থেকেই মগজ ধোলাই করে নিজেদের কব্জায় নিয়ে নিয়েছিল এবং দ্রুত রাজা করার প্রলোভনে প্রলুব্ধ করে সফল হয়েছিল,তারই ফল স্বরূপ 1963 সালে হোপ কুক রাজকুমার পালডেনকে বিয়ে করে এবং 1963 সালেই সিকিমের রাজা তাশি নামগ্যালের মৃত্যু হয় মানে তাকে হত্যা করা হয় এবং যুবরাজ রাজা হন৷তাছাড়া বিয়ে করার আগে হোপ কুকের এমন কি দায়বদ্ধতা ছিল যার জন্য বিয়ে করার আগে ই চার বছর ধরে সিকিমের ভাষা,সংস্কৃতি,পোষাক সব শিখতে হয়েছিল?ওসব তো বিয়ের পরও শেখা যেত ধীরে ধীরে৷তাকে সিকিমের রানী হতে হতো আর যে দেশের রানী হতে হবে সেই দেশের সংস্কৃতির সাথে মিলে না গেলে জনগন তাকে আপন করবে না তাই এই তাড়াহুড়ো৷)কিন্তু এই গল্পের ক্লাইম্যাক্স এখনও বাকি আছে। হোপ কুক বিয়ের আগে সিকিমের সংস্কৃতিকে পুরোপুরি নিজের করে নিয়েছিল। সেখানে ভাষা থেকে শুরু করে পোশাক পর্যন্ত সব কিছুতেই হোপ কুক একজন সাধারণ মেয়ে ছিল। কিন্তু তার বিয়েতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতও উপস্থিত ছিলেন। মার্চ ১৯৬৩ সালে এই বিয়ে হয় এবং একই বছর ডিসেম্বর মাসে রাজা তাশি নামগ্যালের মৃত্যু হয়। এরপর যুবরাজ পালডেন নামগ্যাল রাজা হন এবং তার আমেরিকান স্ত্রী হোপক সিকিমের রানি হন। রানি হবার পর হোপক ভারত বিরোধী কথা বলতে শুরু করে। সে বিদেশি মিডিয়াকে ডেকে নিয়ে ইন্টারভিউ দেয় এবং তার বক্তব্যদেশী-বিদেশি খবরপত্রে ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেত। হোপ কুক বলেছিলেন, সিকিম একটা স্বাধীন দেশ। ভারত যেন আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করে। আমেরিকার লাইফ ম্যাগাজিনে এক শক্তিশালী নারীর মতো রানী হোপের ওপর কভার স্টোরি ছাপা হয়েছিল। সিকিমের রাজ পরিবারে রাজা পালদেন নামগ্যালের থেকে বেশি প্রভাব গড়েছিলেন তাদের আমেরিকান রানী। শোনা যায়, আমেরিকা সিকিমে নিজেদের সেনা ঘাঁটি গড়তে চেয়েছিল, যেখানে থেকে তারা চীন আর ভারত—দুটোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে। সিকিম জুড়ে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর জাল বিস্তার করেছিল। কিন্তু তখনই পুরো
খেলা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল।সিকিমে ওই সময় যা কিছু ঘটছিল, তা নিয়ে সাংবাদিক দেবদত্ত তাঁর বই “অজিত ডোভাল অন আ মিশন”-এ বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সিকিমের ৭০% মানুষ নেপালি ছিল। তারা সবাই ভারতের সঙ্গে যোগ দিতে চেয়েছিল। তখন আইবির অফিসার ছিলেন অজিত ডোভাল, তিনি স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজ পরিবারের বিরুদ্ধে জন আন্দোলন ছড়িয়ে দিলেন। এই অসন্তোষ সিকিমের রাজতন্ত্রের অবসানের কারণ হলো। ভারতের সমর্থনে আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে হোপ কুক আমেরিকায় ফিরে গেলেন।হোপ কুক তাঁদের ৮ বছরের ছেলে আর ৫ বছরের মেয়েকে ছেড়ে অ্যামেরিকা চলে গিয়েছিল তড়িঘড়ি৷আমেরিকা পৌঁছানোর পর সে তালাকের প্রক্রিয়া শুরু করে দিলো। তখন ই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে হোপ সিআইএ-এর এজেন্ট, যে তার মিশনে ছিল। যখনই তার মনে হলো যে তার বিপদ হতে পারে, সে তার স্বামী, সন্তান আর দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো। সিকিমের এই গল্পটা প্রায় একই সময়ের, যখন ক্যামব্রিজে রাজীব গান্ধী এক ইতালিয়ান মহিলা আন্তোনিয়া মাইনোর সঙ্গে মেলামেশা করছিলেন। দুই গল্পের মধ্যে অনেক মিলও আছে, অনেক পার্থক্যও আছে। সেই মিল আর পার্থক্য কী? সেই সিদ্ধান্ত আমরা দর্শকদের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি৷ শুধু এই টুকুই বলতে চাই যে সিকিমের মানুষগুল৷বুদ্ধিমান ছিলো তারা সময়মতো নিজেদের রানী হিসেবে গজানো এক বিদেশী মহিলাকে চিনে নিয়েছিল। সোনিয়া গান্ধী যখন এসেছিলো, তখন ভারতে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন স্টেরা। তিনি তার স্বামীর সবচেয়ে কাছের বন্ধু সতীশ শর্মার স্ত্রী ছিলেন। স্টেরা ডাচ নাগরিক ছিলেন। রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন সতীশ শর্মা সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি ছিলেন। ক্ষমতার আড়ালে তখন কি কি ঘটেছিল, তা আমরা কেবল কল্পনা করতে পারি। আমরা নিজেদের তরফ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ প্রকাশ করতে চাই না। বড় বড় শক্তিশালী মানুষদের প্রেমের জালে ফেঁসে যাওয়া বা হানি ট্র্যাপে পড়া বিশ্বজুড়ে ঘটে থাকে।গুপ্তচর সংস্থার এটা সবচেয়ে পরীক্ষিত পদ্ধতি। কোল্ড ওয়ারের সময় কেজিবি আর সিআইএর অনেক হানি ট্র্যাপের গল্প শোনা যায়।সব সময় প্রমান পাওয়া যায়নি৷সিকিমের আমেরিকান রাণী নিয়ে ও একই কথা বলা হয়, এটা শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কিন্তু এরকম উদাহরণ বারবার সামনে আসে। লাদাখে অসন্তোষ জাগিয়ে তোলার পিছনে সোনম ইয়াংচুকের কাহিনিতেও ‘রেবেকা নরম্যান’ নামে এক আমেরিকান মহিলার নাম আসে। বলা হয় ১৯৯২ সালে ওই আমেরিকান মহিলার সঙ্গে মিলেমিশে ইয়াংচুক লাদাখে শিক্ষা বিপ্লবের কথা বলেন৷পুরো লাদাখে ২০১৮ পর্যন্ত একটাও বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সোনম বাংচুক সেই নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে মানুষকে প্ররোচিত করেছিল, যাঁরা দশক ধরে অবহেলিত লাদাখে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় খুলিয়েছিল। অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করিয়েছিল এবং লাদাখকে ভারতের মূল স্রোতের সাথে যুক্ত করেছিল। আসামে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তরুণ গগৈ,তার ছেলে গৌরব গগৈয়ের গল্পটাও ঠিক একই রকম আন্তর্জাতিক ধাঁচের। ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বের এক রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে ২০১০ সালে জাতিসংঘ সদর দফতরে যায়, যেখানে সে একজন ব্রিটিশ৷ইন্টার্ন এলিজাবেথ কোলবার্নের সঙ্গে দেখা হয়। তাদের দুজনের মধ্যেও নাকি ভালোবাসা হয় আর ৩ বছরের মধ্যে বিয়ে ও করে ফেলেন। পরে জানা যায় যে ওই মহিলা জর্জ সোরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের এক মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী পাকিস্তানের এক এনজিওতে কাজ করে, যার ব্যাপারে সবাই জানে যে তাকে পিছন থেকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৩ সালে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে আর তার স্ত্রী ইচ্ছে মতো আটারি বর্ডার দিয়ে পাকিস্তানে আসা-যাওয়া করতো, যেন তাদের শ্বশুর বা বাপের বাড়ি। গৌরব গগৈ প্রথমবার ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য হন৷আর লোকসভায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, ভারতীয় পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরগুলোর ইউরেনিয়াম সাপ্লাই কোথা থেকে হচ্ছে? মেক ইন ইন্ডিয়ার আওতায় কী কী অস্ত্র আর বিস্ফোরক তৈরি হচ্ছে? এই ব্যাপারে সরকারের নীতি কী? ভারতীয় বিমান বাহিনীর কতগুলো এয়ার স্কোয়াড্রনের দরকার? ২০১৮ সালে ধারা ৩৭০ তুলে নেওয়ার ঠিক আগে গৌরব গগৈ জানতে চাইলেন কেন্দ্রীয় সরকারের কাশ্মীর নিয়ে কী নীতি? তার ওপর ভারতীয় জল সম্পদ আর নদীগুলোর জলের কৌশলগত ব্যবহার সম্পর্কেও প্রশ্ন তুললেন। গৌরব গগৈ কেন এসব জানতে চেয়েছিলেন? সেটা একটু পাশ কাটিয়ে যাই। আসল প্রশ্ন হলো—কোনো চাপেই কি এমনটা হতে পারে যে কেউ নিজের দুই নাবালক ছেলেকে হিন্দু থেকে খ্রিস্টান বানিয়ে দেবে আর তাদের ভারতীয় নাগরিকত্বও ত্যাগ করে দেবে? কেউ যদি চাপের মধ্যে ও এই কাজটা করে, যেমন নিজের ছেলের ধর্ম পরিবর্তন বা পাসপোর্ট বদলানো, এটা মোটেও সহজ সিদ্ধান্ত হয় না। যদি আমার স্ত্রী এসে বলে যে আমার ছেলেকে তুমি আজ ইউকে-এর নাগরিক করো—সে সিকিমের যুবরাজ হোক, গান্ধী পরিবারের কোন পুত্র হোক, আসামের মুখ্যমন্ত্রীর পুত্র হোক বা অন্য কেউ—দেশে কি কি ঘটনা ঘটে চলেছে সেটা বোঝা কঠিন নয়।ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলো জানে তাদের এজেন্টদের সত্যি যে কোন সময় সামনে আসতে পারে। তাই আগে থেকেই তারা তাদের সুরক্ষার পুরো ব্যবস্থা চালু রাখে। যেই মুহূর্তে কারো বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে, তারা এটাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলে চিহ্নিত করে তাদের প্ল্যানও চালু করে দেবে। এরা হলো সেই ট্রোজান হর্স, যার বিরুদ্ধে কোনো সেনা, কোনো নিরাপত্তা সংস্থা বা কোনো সরকারই লড়তে পারে না। এমন ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে হয় শুধু সাধারণ মানুষকেই। ঠিক যেমনভাবে সিকিমের মানুষ দিয়েছিল, যার পর আমেরিকার রানীকে প্রাণ বাঁচিয়ে দেশে ফিরে যেতে হয়েছিল।গৌরব গগৈ কে নিয়ে হেমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্যগুলো সবাই শুনুন ঘটনার সত্যতার আরও প্রমান পাওয়া যাবে৷