পন্ডিত ডাকাত????

“পণ্ডিত ডাকাত বেণী রায়” (যিনি “পণ্ডিত ডাকাত” নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি একরকম বাধ্য হয়েই সংসার ত্যাগ করে দস্যুবৃত্তি বেছে নেন। তাঁর স্ত্রীকে এক মুসলিম সর্দার অপহরণ করলে, সেই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি বিভিন্ন শ্রেণির হিন্দুদের নিয়ে একটি ডাকাত দল গঠন করেন। তিনি চলনবিলের ভেতরের একটি দ্বীপে তাঁর দলবল নিয়ে থাকতেন।​সেখানে “যবনমর্দিনী” নামে একটি কালীমূর্তি স্থাপন করে তিনি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যবনদের ধরে এনে কালীর সামনে বলি দিতেন এবং তাঁদের দেহ চলনবিলে ফেলে দিতেন। কেবল নিহতদের মাথাগুলো তিনি সংগ্রহ করে রাখতেন। তাঁর থাকার জায়গাকে মানুষ “পণ্ডিত ডাকাতের ভিটা” বলত, আর যবনরা ওই জায়গাকে বলত “শয়তানের ভিটা”।​কোনো হিন্দু জমিদার কখনোই বেণী রায়কে দমনের চেষ্টা করেননি। তিনি দরিদ্র হিন্দুদের কোনো ক্ষতি করতেন না, বরং মাঝেমধ্যে তাঁদের সাহায্য করতেন। ধনী হিন্দুদের ধন-সম্পদ লুট করলেও তিনি অকারণে কাউকে হত্যা করতেন না। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো অনর্থক অত্যাচারও তিনি করতেন না। তিনি কোনো নারী বা শিশুকে অপহরণ করতেন না; এমনকি তাঁদের গায়ে দামী গয়না দেখলেও তা নিতেন না। তিনি স্পষ্টভাবে বলতেন, “আমি হিন্দু ধনীদের কাছে শুধু সাহায্য চাই।” তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তি এতটাই বেড়েছিল যে, তাঁকে দমন করা মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে গণ্য করা হয়।) গ্রামবাংলার প্রান্তরে সবুজ ধানের ঢেউ, নদীর জলে নীল আকাশ, পাখির কলরব বেউ। সেইখানে বাস করিত পণ্ডিত বেণী রায়, শাস্ত্রপাঠে দিন কাটে, সবার প্রিয় ঠাঁই। শিষ্যগণে ঘেরা তার গৃহ ছিল ভরা, ধর্মকথা শুনাইতেন প্রাতে ও সাঁঝপরা। সহধর্মিণী শান্তস্নিগ্ধ, স্নেহভরা প্রাণ, ছোট সংসার সুখের নীড়, মধুর অবিরাম। ধূপের গন্ধ ভাসে ঘরে, মন্ত্রধ্বনি সুর, দুঃখ যেন জানে না পথ, সুখে ভরা পুর। হঠাৎ একদিন কালবৈশাখী ঝড়ের মতন, নেমে এলো অন্ধকার, ভাঙিল জীবন। দূর দেশ হতে এলো এক যবন সর্দার, লুটপাটে মত্ত সে, হৃদয় তার পাথার। রাত্রি গভীর, নিদ্রামগ্ন সারা গ্রামখানি, আক্রমণে ছিন্ন হলো শান্তির বাণী। চিৎকারে ভাঙিল রাত, আগুন জ্বলে চারি, বেণীর ঘর হতে স্ত্রী করিল অপহরণ তারি। বেণী রায় জাগিয়া উঠে দেখেন শূন্য ঘর, স্ত্রীর নামে কাঁদেন তিনি, বুক ভাঙে অন্তর। ধুলায় লুটায়, চুল ছিঁড়েন, আকাশ পানে চায়, “ধর্ম কোথা? ন্যায় কোথা?” প্রশ্ন জাগে হায়। গ্রামবাসী ভীতসন্ত্রস্ত, কেহ করে না রুখ, ক্ষমতাহীন দেখে সবাই, হৃদয়ে শুধু দুখ। সেই দিন হতে বেণীর প্রাণে জ্বলে আগুন, শাস্ত্রপাঠে আর না মন, নেই কোনো গুণ। চোখে তার প্রতিশোধের কঠিন অঙ্গার, নরম হৃদয় রূপ নেয় যেন বজ্রধার। মন্দিরে গিয়ে দাঁড়িয়ে কালীর পায়ের তলে, শপথ করে—“ফিরাবো ন্যায় রক্তের জলে।” ত্যাগ করে শাস্ত্র, ত্যাগ করে শান্ত জীবন, অগ্নিসম প্রতিজ্ঞাতে বদলায় মন। ধীরে ধীরে ছেড়ে দিলেন সংসারের বাঁধন, বুকে শুধু প্রতিশোধ, নেই আর সাধন। জীবন তার বাঁক নিলো অন্ধকার পথে, পণ্ডিত হতে ডাকাইত—গল্প শুরু এতে। বন্ধু শিষ্য দূরে সরে, কেহ বুঝে না মন, একাকী বেণী চলে প্রতিশোধের পণ। নদীর ঘাটে বসে থাকে, রাত কাটে জাগি, চোখে তার আগুন জ্বলে, অশ্রু গোপন লাগি। “যে ছিনাইল আমার প্রাণ, ছিনাইল প্রাণসাথী, তাহার রক্তে লিখিব আমি প্রতিশোধের গাথা এই।” এমন করে দিন যায়, রাত যায় ধীরে, বেণীর মন ডুবে থাকে অন্ধকার নীরে। একদিন সে দাঁড়াল শেষে অজানা পথে, ফিরে না তাকালো আর পেছনের রথে। গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে গেল নিরুদ্দেশ পানে, শান্ত পণ্ডিত হারাল যেন ইতিহাসখানে। নতুন এক চরিত্র জন্ম নিল ধীরে, ভয়ংকর ছায়া হয়ে বাংলার বুকে নীরে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *