গুগল কে বা এআই কে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে ক্লাউস ফুক্স কে তাহলে বলবে যে একজন বিজ্ঞানী আর গুপ্তচর যিনি মানহাটান প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ নলেজকে চুরি করে গোপনে রাশিয়ার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু যদি সেই জেমিনি বা এআইকেই জিজ্ঞেস করা হয় যে অডলারড অফ বাথ কে তখন জেমিনি বলবে তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক এবং ইংল্যান্ডের প্রথম বিজ্ঞানী। অথচ বাথশহরের অডেলার্ড নামের এই গুপ্তচর প্রায় সেই কাজটাই করেছিলেন যা ক্লাউস ফুক্স করেছিলেন। অডেলার্ড নিজের পরিচয় গোপন করে আরব দুনিয়াতে গিয়েছিলেন সেখানে সংখ্যাতত্ত্ব, পাটিগণিত, বীজগণিত,
চিকিৎসাবিদ্যা, যুক্তিবাদ এই সমস্ত জিনিসকে বুঝে চুরি করে আনতে।
কারণ তখন ক্রুসেডের সময় খ্রিস্টান দুনিয়া আর মুসলিম দুনিয়ার লড়াই চলছে। খ্রিস্টানদের পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে আরবদের হাত থেকে পুনর্দখলের লড়াই। কিন্তু আরব দুনিয়া তখন সব দিক দিয়ে এগিয়ে ইউরোপের থেকে। তাই ইউরোপ থেকে পাঠানো হলো একজন গুপ্তচরকে কি কারণে আরবরা এত এগিয়ে ইউরোপের থেকে। সেই গুপ্তচরের কাজ ছিল সেদিনের অত্যাধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানকে আরব দুনিয়া থেকে চুরি করে ইউরোপে নিয়ে আসা। ঠিক যেমন ক্লাউস ফুক্স এর কাজ ছিল অত্যাধুনিক পরমাণু বিজ্ঞানকে চুরি করে আনা। যখন আমেরিকা রাশিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চলছে।
সময়কাল দুটো কিন্তু আলাদা, একটা হলো 11 শতকের ঘটনা আরেকটা গত শতাব্দীর। কিন্তু প্রেক্ষাপট দুটো প্রায় সমান আর উদ্দেশ্য,সেটা কি? জ্ঞানচুরি যার মাধ্যমে অন্যের আধিপত্যকে ক্ষুন্ন করা যায়। কিন্তু আজকের এআই গুলোর দায়িত্ব হলো দুনিয়াতে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের ইতিহাসকে ছড়িয়ে দেওয়া। তাই ক্লাউস ফুক্স কে বলা হচ্ছে স্পাই আর অডলারড অফ বাথ কে বলা হচ্ছে ব্রিটেনের প্রথম বিজ্ঞানী। অথচ বিজ্ঞানের জন্ম কোনভাবেই ব্রিটেনে নয়,ইউরোপেও নয়। এমনকি যে আরব থেকে জ্ঞান বিজ্ঞানকে ইউরোপ
চুরি করেছিল সেই আরবেও বিজ্ঞানের জন্ম নয়।
বিজ্ঞানের জন্ম এই ভারত। ভারতের জ্ঞানে বলিয়ান হয়েই আরব দুনিয়াতে জ্ঞানের প্রসার হয়েছিল। যাকে বলা হয় ইসলামের স্বর্ণযুগ। যার বলে বলিয়ান হয়ে 200 বছর ধরে চলা দুস্ট ইউরোপীয়দের পর্যদস্ত করেছিল আরবরা।
ইসলামের স্বর্ণযুগ কোন সময়কে বলা হয়? এইটথ সেঞ্চুরি থেকে, আর যেই শহরকে কেন্দ্র করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটেছিল সেটা হল মূলত ইরাকের বাগদাদ। বাগদাদে হাউজ অফ উইজডম তৈরি করা হলো। যেখানে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা হবে এটাই উদ্দেশ্য ছিল। এটা ছিল একটা বিশাল লাইব্রেরিও। আব্বাসীয় খলিফার শাসন তখন বাগদাদে,বলা যেতে পারে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা বংশ। এই হাউস অফ উইজডমের আরেক নাম
ছিল বায়াত আল হিকমা।
মঙ্গলরা অর্থাৎ মুঘল বাদশাহদের পূর্বপুরুষরা বাগদাদ দখল করে। আর এই বাইত আল হেকমাকে জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এখানে অজস্র বই বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সবকিছু পুড়িয়ে দেওয়া হয় অথবা টাইগ্রিস নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাটাও মোটামুটি প্রায় একই সময়ে যখন বখতিয়ার খলজির আক্রমণে নালন্দা, বিক্রমশিলা আর ওদন্তুপুরি পুড়ে ছাই হয়ে গেছিল। যেমন শোনা যায় যে নরপিশাচ বখতিয়ার খলজির জ্বালিয়ে দেওয়া আগুনে বইপত্রগুলো কয়েক মাস ধরে জ্বলেছিল সেই রকমই শোনা যায় যে
বর্বর মঙ্গলদের পুড়িয়ে ভাসিয়ে দেওয়া বইয়ের কালিতে টাইগ্রিস নদী নাকি কালো হয়ে উঠেছিল।
খিলজির হাতে যেমন অসংখ্য পন্ডিতের মৃত্যু হয়েছিল তেমনি শোনা যায় যে মঙ্গলদের আক্রমণে বাগদাদের মাটি লাল হয়ে গিয়েছিল পন্ডিতদের রক্তে।অর্থাৎ মোটামুটি 100 বছরের ব্যবধানে পৃথিবীর দুই স্থানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দুই পিঠস্থান ধ্বংস হয়েছিল বরবর্দের আক্রমণে। একটা ভারতের মূল ভূখণ্ডে আরেকটা হল বাগদাদে। সারা পৃথিবী থেকে জ্ঞান পিপাসুরা আসতেন এই দুই জায়গাতেই। কিন্তু এত কিছুর পরও ভারতে কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা বন্ধ হয়নি।
ইসলামের স্বর্ণযুগ বলে যেটাকে বলা হয় সেটা কিন্তু বাগদাদে পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছিল সেই 13 সেঞ্চুরিতেই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত এই পুরো আরব দুনিয়া থেকে আর কোন জ্ঞানী বা বিজ্ঞানীর কথা শুনতে পাবেন না। বা আজকের দিনেও আরব দুনিয়াতে এত তেলের টাকা আছে কিন্তু কোন নতুন বিজ্ঞানের আবিষ্কার হলো সেটা শুনবেন না। শুধু শুনবেন যে ওখানে যুদ্ধ চলছে, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ হয়ে চলেছে অনবরত। কি কারণে যে এত বারংবার আক্রমণ সত্ত্বেও ভারতের বুক থেকে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা কোনদিন মুছে গেল না আর আরব দুনিয়া থেকে সব ধুয়ে মুছে গেল
একটা আক্রমণেই আর চিরকালের মত অন্ধকারে ডুবে গেল আরব দুনিয়া।
কারণ আরব দুনিয়াতে যেই জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা হতো সেটা আসলে ভারত থেকে ধার করা জ্ঞানবিজ্ঞান বাগদাদের ওই হাউস অফ উইজডমে রাখা হতো ভারতীয় গ্রন্থগুলোর অনুবাদ ভারত থেকে পন্ডিতরা ওখানে গিয়ে থাকতেন,পড়াতেন বিজ্ঞান চর্চা করতেন।সৌরজগতের কেন্দ্রে যেমন সূর্য আর তার আলোকেই আলোকিত হয় বাকি গ্রহ আর উপগ্রহগুলো সেই রকম ভারত ছিল জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার একদম কেন্দ্রে সেই জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হয়েছিল আরব দুনিয়ার মত গ্রহগুলো আর সেখান থেকে ইউরোপের মত উপগ্রহগুলো।
কিভাবে তার ঐতিহাসিক তথ্যই এখন দিচ্ছি সময়টা ষষ্ঠ শতক, কথিত আছে পারস্যের সম্রাট প্রথম খসরু খবর পান যে ভারতে নাকি মৃত মানুষকে জীবিত করার মন্ত্র জানা আছে। তিনি বরজুয়া নামে তার এক রাজবৈদ্যকে পাঠান ভারতে। রাজবৈদ্য ফিরে এসে বলেন যে ওষুধগুলো হলো, ভারতের লেখা বিভিন্ন বই,তার মধ্যে যে জ্ঞান লুকিয়ে আছে সেগুলোই আর কিছু নয়। এরপরে আরব দুনিয়ার শাসকরা ভাবতে থাকেন যে কি করে ভারতের জ্ঞানকে আহরণ করা যায়। সেই উদ্দেশ্যে বাগদাদের এই হাউস অফ উইজডম বানানো হয়েছিল। কে বানিয়েছিলেন? খালিফা হারুন আল রশিদ। কিন্তু তার কাজের ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল তার পিতামহ খলিফা আল মানসুরের সময়।
খালিফা আল মানসুর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতীয় পন্ডিতদের। যাতে তারা সেখানে গিয়ে ভারতীয় জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে পারেন। এই ভারতীয় পন্ডিতদের মধ্যে কারা কারা ছিলেন? প্রথমে যে নামটা আসে সেটা হল আচার্য কঙ্ক বা আচার্য কনক্ক্য। যিনি ছিলেন একজন গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিদ। তিনি শূন্যের ব্যবহার, দশমিকের ব্যবহার এইগুলো আরব দুনিয়াকে শিখিয়েছিলেন। এর আগে আরব দুনিয়াতে আবজাত সংখ্যাতত্ত্ব চলছিল। যেখানে সবচেয়ে বড় সংখ্যা ছিল 1000। এর থেকে কোন বড় সংখ্যা হলে সেটাকে কি করে লিখতে হবে সেটা কিন্তু আরব দুনিয়া জানতো না।
ভারতের সংখ্যাতত্ত্ব জানার পর আরবরা বুঝতে পারল যে কি করে যেকোন বড় সংখ্যাকে লেখা যায় এবং তার উপর যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ কি করে করা যায়। ব্রহ্মগুপ্তের লেখা ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত আর খন্ডখ্যক। এই দুটো বইয়ের সাথে আরব দুনিয়ার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আচার্য কনক্ক্য। শুধু তাই নয় পৃথিবী সহ সব গ্রহ যে সূর্যের চারদিকে ঘুরে আর পৃথিবী যে চ্যাপ্টার নয় গোল ইত্যাদিও আরবরা জানতে পারল এনার কাছ থেকেই। আর্যভট্টের সূর্য সিদ্ধান্তের সাথে পরিচয় ঘটলো আরব দুনিয়ার যার মূল ছিল সিদ্ধান্ত পদ্ধতি। যার মধ্যে ছিল গণিতের বিশেষ করে ত্রিকোণমিতির ব্যবহার।
কোন গ্রহের ব্যাস, তাদের কক্ষপথের দৈর্ঘ্য, কক্ষপথের পর্যায়কাল ইত্যাদি নিখুত করে গণনা করা সম্ভব হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত পদ্ধতিতে চন্দ্রগ্রহণ অথবা সূর্যগ্রহণের নিখুত সময় বলে দেওয়াও যেত। এই সিদ্ধান্ত পদ্ধতিতেই আনুমানিক 770 খ্রিস্টাব্দে আচার্য কনক্ক উজ্জয়নী থেকে বাগদাদে আসেন খালিফা আল মানসুরের আমন্ত্রণে। বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যাকে বলা হয় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জ্ঞান-বিজ্ঞান যার জন্ম ভারতে তা তখন প্রথমবার ভারত ছেড়ে পশ্চিমের দিকে রওনা দিল। আচার্য কনক্কর হাত ধরে মোহাম্মদ আল ফাজারী আর ইয়াকুব বিন তারিক এই দুজনকে খালিফা নিয়োগ করলেন
আচার্যের সাথে কাজ করবেন বলে। ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্তের আরবি অনুবাদ হল জিস আলস সিন্ধ হিন্দ এই বইয়ের মাধ্যমে আধুনিক গণিত,ত্রিকোণমিতি,জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি প্রথম কোন অভারতীয় ভাষাতে লেখা হলো এই জিস আল সিন্ধ হিন্দ বইটাকে আরো ভালো করে লেখেন আল খাওয়ারিজমি তিনি আরো একটা বই লেখেন যার নাম তিনি দেন হিসাবউল হিন্দ। এই বই দুটোকেই বলা হয় যুগান্তকারী দুটো বই। আল খাওয়ারেজমি ছিলেন এই ইসলামের স্বর্ণযুগের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। জন্ম খোয়ারা আজম শহরে। কর্মজীবন কেটেছে বাগদাদের হাউজ অফ উইজডমে খলিফা আল মামুনের সময়।
তিনি শুধু ভারতীয় সংখ্যাতত্ত্ব নয়
ভারতের বীজগণিত কোয়াড্রেটিক ইকুয়েশন ইত্যাদি কেও লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি আরো একটা বই লেখেন যেটা হল আল-যাবার যার থেকেই অ্যালজেব্রা কথাটা এসেছে। আল খোয়ারিসমিকে বলা হয় বীজগণিত বা অ্যালজেব্রার জনক। তিনি কিন্তু তার কাজে ভারতীয় জ্ঞানের অবদানের কথা কোনদিন অস্বীকার করেননি। তার লেখা বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদ হয় আলগরিথমি দি নিউমেরো ইন্ডোরাম। অর্থাৎ আল খোয়ারিজ মির লেখা ভারতীয় সংখ্যাতত্ত্ব। এই আলগরিদমিক থেকেই আজকের কম্পিউটারের যুগে অ্যালগরিদম কথাটা এসেছে। যার অর্থ হল ধাপে ধাপে একটা প্রবলেমকে সলভ করা।
এই খয়ারজম নামের জায়গাতেই জন্ম আলবিরুনী যিনি ছিলেন এই ইসলামিক স্বর্ণযুগের আরেক জ্যোতিষ্ক। তিনি তার কিতাবুল হিন্দে আচার্য কনক্কর কথা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে লিখে গেছেন। এরপরে দ্বিতীয় নাম হলো আচার্য ধনপতি যিনি ছিলেন চিকিৎসাবিদ। আব্বাসীয় খলিফারা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বাগদাদে। ভারতীয় চিকিৎসালয়ের আদলে সেখানে একটা হাসপাতাল তৈরি হয়েছিল যার নাম দেওয়া হয়েছিল বিমারিস্থান মানে অসুস্থদের জায়গা। সেই হাসপাতালের সুপারইন্টেন্ডেন্ট ছিলেন এই আচার্য ধনপতি। এই বিমারিস্থান হাসপাতালের বাকি চিকিৎসকরাও ছিলেন ভারত থেকে আগত।
ভারতীয় চিকিৎসা, ভারতের আয়ুর্বেদ, সার্জারি ইত্যাদিকে নিয়ে আসেন আরব দুনিয়াতে। সুশ্রুত সংহিতাকে অনুবাদ করা হয় কিতাব ই সুশ্রুত। ঋষি বাগভট্টের অষ্টাঙ্গ হৃদয় সংহিতাও অনুবাদ হয়। এই সময়েই আচার্য ধনপতির জীবনীকার ইবান আল নাদিমের লেখা থেকে জানা যায় যে আচার্য ধনপতির কতটা অবদান ছিল ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতিকে আরব দুনিয়াতে নিয়ে আসার। এই বিমারি স্থান থেকেই পরে অনেক নামি দামি আরবীয় চিকিৎসক তৈরি হয়েছেন। যারা ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতিতে সুদক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। যেমন আল রাজি আল তাবারী ইত্যাদি।
খলিফা হারুন আল রশিদের কথা তো অনেকেই জানি। কিন্তু খুব কম লোকই জানি যে যখনই তিনি অসুস্থ হতেন তখন এই বিমারিস্তান হাসপাতালের আরেক আচার্য মংখর ডাক পড়তো। হারুন আল রশিদের অনেক গুরুতর অসুখের চিকিৎসা তিনি করেছিলেন। এই আচার্য মংখ চরক সংহিতাকে অনুবাদ করেছিলেন আরবিতে। বিভিন্ন পয়জনের অন্টিডোট বিভিন্ন ওষুধের গুণাবলী ইত্যাদির ওপর তিনি বই লিখেছিলেন আরবিতে। শুধু পুরুষরা নন আল জাহিদ নামের একজনের লেখাতে পাওয়া যায় যে পন্ডিত রুপা নামের একজন মহিলা পন্ডিতের কথাও যাকে আরবীয় ঐতিহাসিকরা রুসা নামে উল্লেখ করেছেন।
তিনিও ভারত থেকে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন প্রায় একই সময় মহিলাদের চিকিৎসা অর্থাৎ গাইনোকোলজিকে তিনি আরব দুনিয়াতে নিয়ে এসেছিলেন। বিষক্রিয়ার চিকিৎসার উপরও তার প্রচুর কাজ ছিল। অগধ তন্ত্রকে আরবিতে তিনি লিখেছিলেন। ভারতের জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চাতে মহিলাদের অবদান যে কম ছিল না এই আচার্য রুপাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যিনি মুসলিম দুনিয়াতে গিয়ে তাদের চিকিৎসা করেছেন, চিকিৎসাবিদ্যা শিখিয়েছেন। এছাড়াও হারুন আল রশিদের ভাই ইব্রাহিম যখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন আচার্য ভেলা তাকে ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করে মৃত্যু মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন বলে জানা যায়।
আয়ুর্বেদের ত্রিদশা তত্ত্ব তিনি আরব দুনিয়াকে শিখিয়েছিলেন। ইবান সিনা নামের একজন আরবীয় চিকিৎসক ভারতীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করেন। ভারতে তখন ডায়াবেটিস রোগকে শনাক্ত করার উপায়ও জানা ছিল। হাড়ের অস্ত্রপ্রচার, চোখের ছানি অপারেশন ইত্যাদি তিনি আল-কানুন নামের একটা বইতে লিপিবদ্ধ করেছেন। আয়ুর্বেদের ত্রিদশা পদ্ধতিকে উনি নাম দিয়েছিলেন আখলাক পদ্ধতি। এতো গেল শুধু গণিত আর চিকিৎসাবিদ্যা দিক।কিভাবে ভারতীয় জ্ঞান, ভারতীয় আচার্যদের হাত ধরে
ভারত থেকে আরবে প্রবেশ করেছিল।
কি করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান ভারতের বুকে বিভিন্ন আরবীয় পন্ডিতদের জন্ম দিয়েছিল। জাবির ইবান হাইয়ান নামের একজনের কথা আমরা জানি যাকে ফাদার অফ কেমিস্ট্রি বলা হয়ে থাকে। তিনি ভারতের রসায়ন এবং ধাতুবিদ্যাকে খুব ভালো করে পড়েছিলেন এই বাগদাদে। ভারতের ধাতুবিদ্যাতে পারদ এবং সালফারের যে ব্যবহার রয়েছে সেটা তিনি শিখেছিলেন। ভারতের ল্যাবোরেটরি পদ্ধতিও তিনি শিখেছিলেন। ভারতের পুরনো গ্রন্থে পাওয়া যায় যে সালফিউরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড কি করে তৈরি করতে হয়। ডিস্টিলেশন প্রসেস,
ক্রিস্টালাইজেশন প্রসেস, ধাতু নিষ্কাশন, সোনা গলানোর পদ্ধতি ইত্যাদি ইত্যাদি।
এগুলোকে তিনি সংস্কৃত থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। ভারতের পঞ্চতন্ত্র অনুবাদ হয় আরবিতে যার নাম হয় কালিলা ওয়া দিমোনা। আচার্য মংকর কথা আগেই বলেছি তিনি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বেশ কিছুটা অংশ অনুবাদও করেছিলেন। খলিফা আল মামুন হারুন আল রশিদের পুত্র ভারতীয় পুস্তককে যিনি ঠিকভাবে অনুবাদ করতেন তাকে সেই বইয়ের ওজনের সমান স্বর্ণ মুদ্রা উপহার দিতেন। এইভাবে ভারতের জ্ঞান আরব দুনিয়াতে গিয়ে আরবিতে লিপিবদ্ধ হলো। এরপর এই ভারতীয় জ্ঞান আরব থেকে ইউরোপে গিয়ে কি করে
পৌঁছলো?
আল খোয়ারিজমির লেখা বই থেকে ফিবোনাচি লিখলেন লাইবার এবাকি যাতে উনি একটা কথা লিখলেন যেটি হল মোডাস ইন্ডোরাম অর্থাৎ ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি এর থেকে শূন্য দশমিক পাটিগণিত ইত্যাদি ইউরোপে পা রাখলো ইভান সিনার কথা অলরেডি বলেছি ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতির উপর লেখা তার বই ছিল আলকানুন সেটাই হয়ে উঠেছিল ইউরোপের চিকিৎসার একমাত্র বাইবেল সপ্তদশ শতক পর্যন্তই ইউরোপে এই বইটা পড়েই ডাক্তারি শিখত সবাই। আগেও বলেছি যে ডায়াবেটিস বা রক্তের শর্করার উপস্থিতি শনাক্ত করার পদ্ধতি প্রাচীন ভারতে জানা ছিল। তো ভারতীয় ভাষাতে শর্করা আরবে গিয়ে হলো
শুক্কার যেটা ইউরোপে গিয়ে হয়ে গেল সুগার।
কার্পাস হয়ে গেল আরবিতে কুটন। যা ইউরোপে গিয়ে হলো কটন। নিম্বু থেকে লিমু এবং সেটা হয়ে গেল লেমন। ক্রুসেডের সময়ে খ্রিস্টানরা বুঝতে পারে যে মুসলিমরা তাদের থেকে অনেক অনেক এগিয়ে তারা আরব দুনিয়াতে আসতে শুরু করল এই জ্ঞান আহরণের জন্য। স্পেনের টোলেডো নামের জায়গাটা এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। আর্চ বিশপ রেমান্ড অফ টলেডো সবাইকে উৎসাহিত করতে লাগলেন আরবিও টেক্সটকে ল্যাটিনে অনুবাদ করার জন্য। টোলেডোকে বলা হয় সেদিনের সিলিকন ভ্যালি। শুধু টোলেডো নয় সিসিলির সম্রাট দ্বিতীয় রজার কে বলা হয় খ্রিস্টান আর মুসলিম দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সেতু।
তিনি আরবীয় টেক্সটকে অনুবাদের জন্য প্রচুর বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই সময় সিসিলি হয়ে উঠেছিল ইউরোপের অনুবাদ কেন্দ্র। আরবিককে তিনি ল্যাটিনের পাশাপাশি তার দরবারের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ভারতীয় কেমিস্ট্রি আরবদের হাত ধরে পৌঁছলো ইউরোপে। আগে ইউরোপে হাসপাতালের কনসেপ্ট ছিল না। বিমারি স্থানের মত করে হাসপাতাল তৈরি হতে লাগলো ইউরোপে। যেই বিমারি স্থানের কথা আগে বলেছি ভারতের চিকিৎসালয়ের আদলে তৈরি। ভারতের কনৌজকে বলা হতো পারফিউম ক্যাপিটাল অফ ইন্ডিয়া।
ভারতের এই পারফিউম তৈরির বিজ্ঞানের শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে। সেই পদ্ধতি আরব হয়ে ইউরোপে পৌঁছয় 13 শতকে। এইসব জ্ঞান ইউরোপের চোখ খুলে দিল। তারা বুঝলো তারা কতটা অন্ধকারে, সারা দুনিয়া থেকে কতটা পিছিয়ে।চার্চ তাদের কতটা অজ্ঞানতার শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে এর থেকেই শুরু ইউরোপের নবজাগরণ বা রেনেসা অর্থাৎ 13 শতকে মঙ্গলদের বাগদাদ আক্রমণ আর উইজডম অফ নলেজের ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে ইসলামিক স্বর্ণযুগের শেষ আর তার 100 বছর পরে সেই জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হয়ে ইউরোপে নবজাগরণের শুরু কোন জ্ঞান যেই জ্ঞান আসলে ভারতীয় জ্ঞান ছাড়া আর কিছু না।
ভারতীয় চিকিৎসা, ভারতের আয়ুর্বেদ, সার্জারি ইত্যাদিকে নিয়ে আসেন আরব দুনিয়াতে। সুশ্রুত সংহিতাকে অনুবাদ করা হয় কিতাব ই সুশ্রুত। ঋষি বাগভট্টের অষ্টাঙ্গ হৃদয় সংহিতাও অনুবাদ হয়। এই সময়তেই আচার্য ধনপতির জীবনীকার ইবান আল নাদিমের লেখা থেকে জানা যায় যে আচার্য ধনপতির কতটা অবদান ছিল। ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতিকে আরব দুনিয়াতে নিয়ে আসার। এই বিমারি স্থান থেকেই পরে অনেক নামি দামি আরবীয় চিকিৎসক তৈরি হয়েছেন। যারা ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতিতে সুদক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। যেমন আল রাজি আল তাবারী ইত্যাদি।
দুঃখের বিষয় আমাদের ইতিহাস বইতে ভারতের এই অবদানের কথা বলতে গেলে প্রায় কিছুই লেখা নেই। আর আজকের দিনের এআইও ইসলামের স্বর্ণযুগ বা ইউরোপের রেনেসার পেছনে গ্রিকদের অবদানকেই বেশি করে তুলে ধরে। সেটা যে কত বড় ভুল সেটা ব্যাখ্যা করতে আরো একটা আলাদা এপিসোড লাগবে। আজকে সেই সময় নেই। তাই বলব আমাদের নিজেদের পূর্বপুরুষদের অবদানের কথা আমাদেরকেই বেশি করে কিন্তু তুলে ধরতে হবে।
বিশেষ করে শিশুদের,তারা যেন বড় হয়ে ভারতীয় হিসেবে গর্ববোধ করতে পারে।