দরগা ৩

পীর বড়খাঁ গাজী (গাজীবাবা নামে পরিচিত)বরখান গাজী হলেন দক্ষিণবঙ্গ ও সুন্দরবন অঞ্চলের একজন পীর, যিনি বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপর অলৌকিক ক্ষমতা ধারী বলে জন্য প্রচারিত এবং মুসলিমানদের সাথে সাথে হিন্দুরাও ওখানে যায়(কেন কে জানে?)পুজা করে৷ তাঁর আখ্যান ‘গাজীর গান’ বা ‘গাজীর পট’-এর মাধ্যমে লোকগাথায় বেঁচে আছে, যেখানে তিনি বনবিবি(আসলে বনদেবী)ও দক্ষিণ রায়ের(বাঘের লৌকিক দেবতা) মতো স্থানীয় দেবতা ও পীরদের সাথে যুক্ত। তিনি মূলত সুন্দরবনের হিংস্র প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতিকূলতা থেকে রক্ষাকারী সত্তা হিসেবে পূজিত হন(আসলে বনদেবী আর দক্ষিণ রায় ই আগে পুজিত হতেন কিন্তু ইসলাম সেসব গ্রাস করে এই পীর পুজা চালু করে) এবং তাঁর আসল পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। পরিচিতি ও বিশ্বাস—-পীর বড়খাঁ গাজী, গাজীবাবা, গাজী সাহেব, মোবারক শাহ গাজী, বরখান গাজী।সুন্দরবনের ভাটি অঞ্চলের বাঘকুলের (বাঘের দেবতা) অধিষ্ঠাতা এবং অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পীর হিসেবে মান্য।হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ তার পূজা করে, বিশেষত মউলে ও বাউলেরা কাঠ ও মধু সংগ্রহের সময় তার স্মরণাপন্ন হন।বাঘ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ন্ত্রণ এবং বিপদ থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। ঐতিহ্য ও আখ্যান গাজীর গান/পট: এটি পীর বড়খাঁ গাজীর জীবন ও কীর্তি নিয়ে গাওয়া লোকগীতি ও চিত্রিত পটচিত্র, যা বাংলার লোকসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র, যা বাংলার লৌকিক ধারার ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ।তাঁর উপাখ্যানগুলো বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলে (যেমন ফরিদপুর, নোয়াখালী, যশোর, খুলনা) প্রচলিত। বিভিন্ন মত ও পরিচয়—-তাঁর জন্মস্থান ও পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত, কেউ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার, কেউ সিলেটের, আবার কেউ অন্য জায়গার বলে মনে করেন।কিছু মতে, তিনি পান্ডুয়ার পীর জাফর খাঁ গাজীর পুত্র ছিলেন, আবার কারও মতে চতুর্দশ শতাব্দীর সুফি খান পরবর্তীকালে বড়খাঁ গাজী নামে পরিচিত হন। সংক্ষেপে, পীর বড়খাঁ গাজী হলেন দক্ষিণ বাংলার লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে প্রোথিত এক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রতিকূল প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযোগ স্থাপনকারী এক রক্ষাকর্তা। পীর বড়খাঁ গাজী (গাজীবাবা, গাজী সাহেব, মোবারক শাহ গাজী, বরখান গাজী ইত্যাদি নামেও পরিচিত) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা অঞ্চলের তথা দক্ষিণ বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের অন্যতম প্রধান পীর। তাকে সুন্দরবনের ভাটি অঞ্চলের ব্যাঘ্রকুলের অধিষ্ঠাতা হিসাবে মান্য করা হয়। এখানকার ক্যানিং থানার অন্তর্গত ঘুটিয়ারি শরীফে (মতান্তরে, বাংলাদেশের সিলেট জেলার শিবগাঁও গ্রামে বা গাজীপুরে) গাজী সাহেবের কবরস্থান বর্তমান। এটি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল মানুষের তীর্থস্থান। উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা তথা দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বড়খাঁ গাজীর একাধিক দরগাহ-নজরগাহ আছে। বিভিন্ন লোককাহিনীতে তাকে একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইসলামধর্ম-প্রচারক হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

পীর গাজী ও তার বাঘ, সুন্দরবন, বঙ্গ, ভারত, ১৮০০ শতাব্দী

পরিচয়—লোককথা অনুযায়ী, বর্তমান দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বেলে-আদমপুর (মতান্তরে, বৈরাটনগর) গ্রামে তার জন্ম হয়। তিনি প্রথম যৌবনে পিতার অতুল ঐশ্বর্য ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য ফকিরি গ্রহণ করেন এবং ভাটি অঞ্চল সুন্দরবনে আসেন। বন্ধু কালুর সহায়তায় বড়খাঁ গাজী বৃহত্তর যশোর জেলার ব্রাহ্মণনগরের হিন্দু রাজা মুকুট রায়ের কন্যা চম্পাবতীকে জোর করে বিয়ে করে। তার দুই পুত্র দুঃখী গাজী ও মেহের গাজী। অধুনা বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজারে আজও গাজী কালু ও চম্পাবতীর মাজার বর্তমান।দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সোনারপুরে জঙ্গল কেটে বসতিও নির্মাণ করেছিলেন বড়খাঁ গাজী। নদী-জঙ্গল অধ্যুষিত এই অঞ্চলে বাঘ, কুমীর, সাপ ইত্যাদিকে যখন ইচ্ছা বশ করতে ও যুদ্ধের সৈনিক করতে পারতেন বলে প্রচার করা হয়৷ রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র সকলের উপর তার সমান প্রভুত্ব বর্তমান। কুমীর-দেবতা গাজি কালু তার বিশেষ বন্ধু(কি ধরণের মিথ্যাচার করে মুসলমানরা!) অনেকের মতে, বড়খাঁ গাজী কারও ব্যক্তিগত নাম নয়, মধ্যযুগীয় বাংলায় ইসলাম প্রচারকদের শীর্ষস্থানীয়রাই বড়খাঁ গাজী নামে পরিচিত। একটি মতে, পাণ্ডুয়ার প্রসিদ্ধ পীর জাফর খাঁ গাজীর পুত্রই বড়খাঁ গাজী। সুকুমার সেনের মতে, চতুর্দশ শতকের পীর সুফি খানই ষোড়শ শতকে বড়খাঁ গাজী নামে পরিগণিত হন। তৃতীয় মতে, পঞ্চদশ শতকের পীর ইসমাইল গাজীই হলেন আলোচ্য বড়খাঁ গাজী।খাড়িগ্রামের মূর্তি অনুযায়ী, তিনি যোদ্ধৃবেশী, অশ্বারূঢ় দৃপ্ত বীরপুরুষ; পরনে পায়জামা চোগাচাপকান পিরান, মাথায় টুপি, মুখে ঘন লম্বা দাড়ি, দীর্ঘ গোঁফ ও গালপাট্টা ঝুলফি, বড়-বড় টানা চোখ, একহাতে অস্ত্র এবং অন্যহাতে ঘোড়ার লাগাম; বুটজুতো সমেত পা-দুটো রেকাবের ওপর স্থাপিত।

গাজী পীরের বিভিন্ন উপাখ্যান

লোককাহিনী অনুসারে, স্থানীয় হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে গিয়ে বহুবার হিন্দু দেবদেবীদের সঙ্গে তার বিরোধ ও সংঘর্ষ ঘটেছে। আঞ্চলিক প্রভুত্বের অধিকার নিয়ে সুন্দরবনের হিন্দু ব্যাঘ্রদেবতা দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে তার প্রবল যুদ্ধ হয়। লোককবি কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল'(১৬৮৬-৮৭ খ্রীষ্টাব্দ) কাব্যের কাহিনী অনুসারে, জগদীশ্বর হিন্দু-মুসলিমের মিলিত দেবতা অর্ধ-শ্রীকৃষ্ণ-পয়গম্বরের (কৃষ্ণপয়গম্বর) বেশধারণ করে গাজী ও দক্ষিণরায়কে শান্ত করেন(মিথ্যাচার এদের চরিত্রে)। ফলে যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, দক্ষিণরায় সুন্দরবনের সমস্ত ভাটি অঞ্চলের, কুমীর-দেবতা কালুরায় হিজলীর এবং গাজীসাহেব সর্বত্র শ্রদ্ধা-সম্মানের অধিকার লাভ করেন।

সর্বত্র সাহেব পীর সবে নোয়াইবে শির

কেহ তাহে করিবে না মানা

 

(মানে এই জেহাদী হিন্দুদের সবার মাথা নত করাবে কিন্তু কেউ তাকে বারণ করবে না)

‘গাজীমঙ্গল’ বা ‘গাজীর গান’ কাব্যে, যুদ্ধে দক্ষিণরায়ের পরাজয় দেখানো হয়েছে। এই কাব্যে গাজীর হাতে হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণের প্রয়াসও প্রকটরূপে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে, আব্দুল গফুরের ‘কালু গাজী ও চম্পাবতী’ কাব্যে গঙ্গা-দুর্গা-পদ্মা-শিব সহ সমস্ত লৌকিক হিন্দু দেবদেবী বড়খাঁ গাজীর আত্মীয়বন্ধু হিসেবে পরিণত হয়েছে।

 

গঙ্গা দুর্গা শিব গিয়া সকলে করিত দয়া

         গাজীর মাসী সকলে বলিত।

ঘুটিয়ারি শরীফ—

ঘুটিয়ারি শরীফে গাজী সাহেবের কবরস্থান বর্তমান। এটি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল মানুষ যায় তীর্থ করতো,হিন্দুরা এত মূর্খ। পুরুষ, নারী এমনকি হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখানে মানতের জন্য আসেন; তবে মহিলা ও হিজড়ারা মাজারে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়  না(তারপর ও যায়এত বেহায়া), পাশের জানালায় ধূপ-বাতি দেয়। গাজীকে জিন্দা পীর হিসাবে মানা হয়। ৭ই আষাঢ় পীরের মৃত্যুর দিন স্মরণ করে প্রতি বছর একসপ্তাহ ধরে বিশেষ উৎসব ও মেলা হয়(মৃত্যু দিনে উৎসব করে এত বর্বর জাতি)। এছাড়া, ১৭ই শ্রাবণ থেকে উদযাপিত বিশেষ উৎসবে অনেক লোকসমাগম হয়। এইসময় নানা ইসলামিক গজল, কাওয়ালি, সুফি তারানা গাজীপীরের উদ্দেশ্যে গাওয়া হয়ে থাকে গাজীবাবার অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে এখানে নানা প্রবাদ প্রচলিত আছে। একটি জনশ্রুতি অনুসারে, একবার এই অঞ্চলে খরা হওয়ায় লোকেরা গাজীবাবাকে বৃষ্টি আনিয়ে দিতে বলেন। গাজীবাবা সেই অনুরোধে সমাধিস্থ হন(ইসলামে সমাধিস্থ হওয়া যায় কি?)। তারপর একজন পাঠান মুসলমান গাজীবাবার সঙ্গে দেখা করতে এসে তাকে মৃত ভেবে ছুঁয়ে ফেলেন। তৎক্ষণাৎ দৈববাণী হয় যে, তিনি মৃত ছিলেন না, সমাধিস্থ ছিলেন(ইসলামে কোন পথে সমাধিস্থ হয়?)। কিন্তু স্পর্শদোষ ঘটায় তার আত্মা পর্দানশীন হয় এবং যে কেউ ভাসাপুকুরে শিরনি দিয়ে মানত করলে তা পূরণ হবে। সেই দিনটি ছিল বাংলা বর্ষপঞ্জীর ৭ই আষাঢ়, অম্বুবাচী। সেই থেকে ঐ তারিখে এখানে তিনদিনের গাজীবাবার জাত বা মেলা, এবং ৪১ দিনের দিন ১৭ই শ্রাবণ উরস অনুষ্ঠান পালিত হয়।(গাজি বাবার ও কি প্রিয়ড হয় নাকি?তাও আবার 41 দিন ধরে?অম্বুবচী কি তাই জানে না মূর্খগুলো তারপর ও দখল করতে গিয়ে এই হাল!) উৎসবের দিনগুলিতে জিয়ারতের সময় বারুইপুরের রায়চৌধুরী জমিদারবাড়ি থেকে আনা শিরনি, বাতি-আতর সর্বপ্রথমে গাজী পীরকে উৎসর্গ করা হয়। কথিত আছে, রায়চৌধুরী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মদনমোহন রায়কে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর খাজনার দায় থেকে উদ্ধার করেছিলেন পীর বড়খাঁ গাজী(জাজিয়া দিয়ে ধর্মান্তরিত হওয়া আটকেছিলেন)। মেদিনীমল্ল পরগণার জমিদারি পেয়ে রায়চৌধুরীরা গাজীকে এখানে পীরোত্তর সম্পত্তি দান করেন(দখল করে নেয় বলে তারা চলে যান) এখানকার ভাসাপুকুর বা মক্কাপুকুরে(মক্কার কোথায় পুকুর আছে?) নরনারীরা শিরনি হিসাবে ফুল-বাতাসা ভাসায়। যার হাতে শিরনি পুনরায় ভেসে আসে, তার মানত অচিরেই পূর্ণ হবে বলে ধরা হয়। এছাড়া, সন্তানের মানতকারীরা সন্তান হলে কচি শিশুকে সাজিয়ে ফুল-আতর দিয়ে মাটির হাড়িতে পুকুরের জলে ভাসিয়ে দেয় এবং বিশ্বাসমতো বাচ্চা হাড়িসহ আপনজনের কাছে শেষমেশ ফিরে আসে প্রতিবার। 



Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *