একটা ১৪ বছরের মেয়ে পাম বিচের একটা ম্যানশনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে,কাঁপছে।হাতে $৩০০ ক্যাশ ধরে আছে। ওই টাকা তার পরিবারের জন্য খুবই জরুরি। আর ভিতরে ওই মেয়ের বাবার বয়সের এক বিলিয়নিয়ার জেফরি এপস্টেইন তার ছোটবেলা ধ্বংস করার অপেক্ষায় বসে আছে। শুধু একটুই না আরও অনেক নাবালিকা মেয়ের সঙ্গেও এমন হয়েছে। আর বিশ্ব তখন চোখ বুজে বসেছিল। কিছু বলেনি,কিছু করেনি কারণ সে এতই শক্তিশালী মানুষ ছিল যে প্রেসিডেন্ট থেকে প্রিন্স পর্যন্ত সবাই তার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চলত কিন্তু যে কাজ আইনজীবীদের পুরো একটা ফৌজও করতে পারল না।
ওটা এক সাধারণ মেয়েই করে দেখিয়েছে। পেশায় এক ঝামেলাপূর্ণ সাংবাদিক আর একজন একক মা। এই কাহিনী জুলি ব্রাউনের, যিনি জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে লড়ে দেখিয়েছেন যে যদি একটা মহিলা দায়িত্ব নিতে পারে, তবে সে তলোয়ারও তুলতে পারে। জুলি ব্রাউন মিয়ামির এক ছোট নিউজরুমে বসে আছে। তার সম্পাদক-এর প্রত্যাখ্যান ইমেইলটা দেখছে। আরেকটা স্টোরি রিজেক্ট হয়ে গেছে। এক মাস ধরে কোনো কাজই পাচ্ছে না। সে একজন একক মা। একজন টিনএজার মেয়ে আর ছেলেকে লালন করতে হয়, একটা সাংবাদিকের বেতনে যা চলে৷
গত ৫ বছর যাবৎ যাতে কোনো উন্নতি হয়নি। তার সহকর্মীরা তাকে ‘দ্য রিপোর্টার হু চেজেস দ্য ডেড স্টোরিজ’ বলত। সে ঝগড়া এড়াত, শক্তিশালী লোকদের থেকে দূরে থাকত বা এমন যেকোনো জিনিস থেকে যেটা তার জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। ৩ বছর আগে সে এক সিটি কাউন্সিলম্যান সম্পর্কে একটা আর্টিকেল লিখেছিল, যিনি ঘুষ নিচ্ছিলেন। স্টোরিটা একদম সত্য ছিল, কিন্তু ওই কাউন্সিলম্যানের ভালো কনেকশন ছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে জুলির গাড়ির টায়ার ফেটে গেছে। রাত ২টায় হুমকির কল আসতে শুরু করল। এমনকি একটা লোক তার মেয়েকে স্কুল থেকে বাড়ি পর্যন্ত ফলো করতে লাগলো।
নিউজপেপার চুপচাপ এই ব্যাপারটা মিটিয়ে দিলো। স্টোরিটা আর দেখা গেল না। তারপর থেকে জুলি সেফ খেলা শুরু করল। লোকাল ক্রাইম, ছোটখাট স্ক্যান্ডাল—এমন কিছু যা খুব বড় না, কিন্তু সেফ খেলে কিছুটা নিরাপদে থাকা যায় আর অবশ্যই তার ডুবতে থাকা ক্যারিয়ারটাও বাঁচে। তার এডিটর সবসময় বলত, ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম হয়তো এখন তোমার জন্য না, জুলি। ৪২ বছর বয়সে সে নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক আর হারিয়ে যেতে থাকা মনে করতে লাগল। সে শক্তিশালী পুরুষদের ভয় পেত কারণ মনে করত তারা সবসময় জিতেই যায়৷
কিন্তু তারপর সব কিছু পাল্টে যেতে চলেছিল। এক শুক্রবার বিকেলে, উইকএন্ডের আগে পুরনো ফাইল ক্যাবিনেটগুলো পরিষ্কার করছিল সে, তখন একটা পুরনো ফোল্ডার পায়। ফোল্ডারের ভিতরে ছিল ২০০৫ সালের একটা পুলিশ রিপোর্ট। রিপোর্টের মার্জিনে একটা নাম লেখা ছিল—ভার্জিনিয়া,বর্ডস মাইনর কেস ডিসমিসড,আরেকটা নাম বারবার চোখে পড়ছিল, সেটা ছিল জেফ্রি এপস্টেইন। বিলিয়নিয়ার, ফিলানথ্রপিস্ট, প্রেসিডেন্টস এবং প্রিন্সের বন্ধু। ‘ডিসমিসড’ শব্দটা দেখে তার মন খারাপ হয়। সে এপস্টেইন সম্পর্কে গুগল করে। বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স অ্যান্ড্রুস, সায়েন্টিস্ট, নোবেল প্রাইজ উইনার—সবাই সামনে চলে আসে।
সেলিব্রিটিদের সঙ্গে তার ছবি। একজন মানুষ যার আয়ল্যান্ডস, প্রাইভেট জেট, ম্যানহাটনের ম্যানশন আর একটা বড় নিউ মেক্সিকোর র্যাঞ্চ আছে। জুলির পৌঁছানো তো অনেক দূরের কথা কিন্তু পুলিশ রিপোর্টগুলো, যেখানে কিশোরী মেয়েরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল ৫৩ পাতার,সব চাপা পড়ে গিয়েছিল। জুলিকে এসব থেকে সরে দাঁড়াতে হতো,সে এটা জানত কিন্তু ওই রাতে সে তিনটা বাজা পর্যন্ত জেগে ছিল।ভাবছিল যে ভার্জিনিয়া রবার্টসের সঙ্গে শেষমেশ কী হয়েছিল? আর তার মামলা কেন বন্ধ করা হলো? জুলি চুপচাপ গোপনে খোঁজখবর শুরু করে।
লাঞ্চ ব্রেকে আর রাতে যখন তার মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে ভার্জিনিয়ার নাম পায় ২০১৫ সালের এক ফেডারেল ল’র সুটে খুঁজে পায়। সেখানে অভিযোগ ছিল এপস্টেইন আর তার শক্তিশালী বন্ধুদের বিরুদ্ধে। সেই ল’র সুট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর সেটা আইনি জটিলতার মধ্যেই চাপা পড়ে যায়। তারপর অজানা কোনো অঙ্কের জন্য সবকিছু সল্ভ হয়ে যায়। ভার্জিনিয়া এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। সবার থেকে লুকিয়ে তার জীবন আবার গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। জুলি রাতে তাকে একটা ইমেইল পাঠায়। কোনো উত্তর আশা না করেই—আমি একজন রিপোর্টার, জেফ্রি এপস্টেইন নিয়ে তদন্ত করছি,এই কথা লিখে।
আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি। তুমি কি আমার সাথে কথা বলবে? তিন দিন চুপচাপ ছিল। তারপর রাত ৪ টায় হঠাৎ তার ফোন বাজে। কলটা ছিল অস্ট্রেলিয়ার একটি নম্বর থেকে। সে বুঝে গিয়েছিল এটা ভার্জিনিয়ার কল। ভার্জিনিয়ার আওয়াজটা নরম ছিল, কাঁপছিল। বছর কয়েকের যন্ত্রণা,তার একটাই প্রশ্নে ফুটে উঠেছিল। তুমি কি নিশ্চিত যে তুমি তার বিরুদ্ধে যাবে? কারণ আমি যতবার চেষ্টা করেছি, আমি বর্বাদ হয়ে গেছি। জুলি কিছুই প্রতিশ্রুতি দেয় না, শুধু শোনে যেভাবে ভার্জিনিয়া যা বলছে। ১৫ বছর বয়সে একজন পরিশীলিত ব্রিটিশ মহিলা গিলিয়ান ম্যাক্সওয়েল তার দিকে এগিয়ে এসেছিলেন। তাকে মার্লাগো রিসোর্ট, ফ্লোরিডায় একটা চাকরি দিয়েছিলেন।
যেখানে সে স্পা অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করছিল। গিলেনই তাকে প্রস্তুত করেছিল। সে আমাকে বলেছিল যে এক ধনী লোকের জন্য ট্রাভেলিং ম্যাসাজ করতে হবে। সে বলেছিল আমি ঘণ্টায় $২০০ উপার্জন করতে পারি। আমি গরীব ছিলাম, জুলি, আর আমার পরিবারের অর্থ দরকার ছিল। গিলেন এপস্টাইনের ম্যাডাম, রিক্রুটার আর ইনফোর্সার হিসেবে কাজ করত। ভার্জিনিয়াকে সে শিখিয়েছিল কিভাবে ক্ষমতাশালী পুরুষদের খুশি করা হয়। প্রাইভেট জেটে উড়তে হতো। প্রাইভেট আইল্যান্ডে নিউ ইয়র্ক, নিউ মেক্সিকো, লন্ডন, প্যারিসে সবসময় এপস্টেইনের সাথে থাকতে হতো। বিশ্বের নানা ক্ষমতাশালী পুরুষদের কাছে তাকে পাঠানো হত।
বছরের নাইট মেয়ার, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত, যতক্ষণ না সে অস্ট্রেলিয়া পালিয়ে যায়। আমি আগেও এই গল্পটা বলেছি। এফবিআই, আইনজীবী, সাংবাদিক কেউই বিশ্বাস করেনি। বিশ্বাস করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কারণ তাদের আইনজীবীরা যে কোন লোককে ধ্বংস করে দেয়। যারা তার বিরুদ্ধে কথা বলে, তারা তোমাকেও ধ্বংস করে দেবে। জুলি কাঁপতে থাকা হাতে ফোনটা নীচে রাখে। সে তার রান্নাঘরে লাইট বন্ধ করে বসেছিল। তার মেয়ে নিজের রুমে ঘুমাচ্ছিল। তখন তাকে বুঝতে পারে যে এটা কোনো গল্প নয়, এটা একটা ভূমিকম্প।
আর যদি সে এই স্টোরিটা পেছনে পেছন দিকে নিয়ে যায়, তখন হয় মেয়েদের ন্যায় মিলবে, নইলে জুলি আর তার আশেপাশের সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। সে তার মেয়ের কথা ভাবে আর তার নিরাপত্তার কথা ভাবে। কিন্তু তারপর সে ভার্জিনিয়ার কথাও ভাবে। ১৫ বছর বয়সে সেই ম্যানশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ভার্জিনিয়া, আর তারপর সে একটা সিদ্ধান্ত নেয়। জুলি জানে একটা ভিকটিম যথেষ্ট নয়। একজন বিলিয়নিয়ারের বিরুদ্ধে যার কাছে আইনজীবীদের পুরো ফৌজ আছে, যারা বছরের পর বছর ধরেই অভিযোগকারীদের চুপ করিয়ে রেখেছে। সে বাকি সারভাইভারদের খুঁজতে শুরু করে।
ওল্ড পুলিশ রিপোর্ট, কোর্টের ডকুমেন্ট, সিল করা ফাইল আর নানা জায়গা থেকে খোঁজ নিয়ে জুলি জানতে পারে কোটনি ওয়াইল্ডের কথা, যিনি ১৪ বছর বয়সে এপস্টেইনের হাতে পাম বিচে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। এরপর সে জানতে পারে মিশেল লিকটের কথা। মিশেলকে ১৬ বছর বয়সে একজন রিক্রুটার প্রস্তুত করেছিল, যিনি মডেলিংয়ের সুযোগ দেয়ার কথা বলেছিল, তারপর তাকে এপস্টেইনের জন্য ম্যাসাজ দিতে $৩০০ দিয়েছিল। একটার পর একটা সার্ভাইভার জুলির সামনে আসতে থাকে, যারা এখন ৩০ বছর বয়সী নারী, কিন্তু তারা এখনও সেই ট্রমা বহন করছে যা তাদের সাথে শৈশব বা কৈশোরে হয়েছিল। প্রতিটা মেয়ের সাক্ষাৎকার জুলির মনকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে৷
এপস্টেইন তার ম্যাসাজ রুমে ওই মেয়েদের কেমন করে টাচ করত,কি কি করতো,ছবি তুলত,তাদের পরিবার, তাদের বন্ধুদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত সব জানলো৷এপস্টিন যেন ওই মেয়েদের নিজের মালিকানায় নিয়ে রাখতো। $২০০, $৩০০, $৫০০ আয় করার গল্প। সেই টাকা যা গরীব বাড়ি থেকে আসা মেয়েদের কাছে অনেক ধন-সম্পদের মতো লাগত আর অন্য মেয়েদের রিক্রুট করার গল্প সব শুনেছিল জুলি। কারণ এপস্টেইন চাইত এবং ওই মেয়েরা তাদের কোনো বন্ধুকে আনলে $২০০ দিত। ভিকটিমদের রিক্রুটার বানানোর গল্প, তাদের লজ্জাকে অস্ত্র বানানোর গল্প, গিল্টের।
গল্পগুলো যা কখনো হারায় না। জুলি দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে শুরু করেছিল। কফি আর নিজের কাজ নিয়ে সারভাইভ করতে থাকল। রাতে মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমাতো। তার মেয়ে প্রতিদিন ডিনারের জন্য তাকে বাড়ি আসতে অনুরোধ করত। কিন্তু জুলি এই কেস নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে আসতে পারতো না,সে কিছু বড় একটা তৈরি করছিল। এমন একটা টাইট কেস যাতে এপস্টেইনের পাওয়ারও তাকে ক্রাশ করতে না পারে। সে এপস্টেইনের প্রাইভেট জেটের ফ্লাইট লক ডকুমেন্ট করে। যেই জেটের ডাকনাম ছিল লোলিতা এক্সপ্রেস, যা অ্যান্ডার এজ গার্লদের দুনিয়া জুড়ে ভ্রমণ করাতো। সেই তার দ্বীপের…
প্রপার্টির রেকর্ড ট্র্যাক করে। যেটার নাম ছিল লিটল সেন্ট জেমস আর লোকজন তাকে পিট ফাইল আইল্যান্ডস বলে। তারপর নিউইয়র্কের ম্যানশন, নিউ মেক্সিকোর রেঞ্চ, সব জায়গা যেখানে সিস্টেম্যাটিক অ্যাবিউজ হয়েছিল। তারপর সে একটা ডকুমেন্ট পায় যা পড়ে তার আত্মা কেঁপে ওঠে।এপস্টিনের ২০০৮ সালের একটা দোষ স্বীকারের মাধ্যমে সমঝোতা ছিল যা এত অনৈতিক আর অশ্লীল ছিল যে আমেরিকার মতো দেশে এরকম হওয়া প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল জুলির। জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মাইনরদের যৌনপল্লীতে ট্রাফিকিংয়ের ফেডারেল চার্জ ছিল। এমন ক্রিমিনাল চার্জ যার সাজা যাবজ্জীবন পর্যন্ত হতে পারে।
আর এফবিআই এর কাছে তার
প্রমাণ ও ছিল,ভিকটিমদের বিবৃতিও ছিল। ফ্লাইট লগসও ছিল, সাক্ষীরাও ছিল কিন্তু তার আইনজীবী এলেন ডারশউইথস এবং কেনেথ স্টার ফেডারেল প্রসিকিউটার আলেক্সান্ডার অ্যাকোস্টার সঙ্গে গোপনে একটা চুক্তি করে ফেলল। চুক্তির নাম ছিল দ্য সুইটহার্ট ডিল আর সেখানে এপস্টেইন দুইটা স্টেট প্রস্টিটিউশন চার্জে অপরাধী হিসেবে আবেদন করে। মাত্র ১৩ মাস জেল ভোগ করে। এর মধ্যে একটা কাউন্ট জেলের প্রাইভেট উইং এ থাকে আর সপ্তাহে ছয় দিন ওয়ার্ক রিলিজ পায় যাতে বাইরে গিয়ে অফিসে তার কাজ করতে পারে। ফেডারেল তদন্ত বন্ধ হয়ে গেল। প্রমাণ গুলো চাপা দেওয়া হল। ভিকটিমদের চুক্তিতে
কখনো বলা হয়নি যে এটা ক্রাইম ভিকটিমস রাইটস অ্যাক্টের সরাসরি লঙ্ঘন ছিল। জুলি ওই ডকুমেন্টটা তিনবার পড়ে, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না। একজন বিলিয়নিয়ার যার বিরুদ্ধে মেয়েদের ওপর নির্যাতনের অপরাধের প্রমাণিত অভিযোগ ছিল, সে সপ্তাহে ছয় দিন জেলের বাইরে ঘোরাফেরা করতে পারে আর যাদের শৈশব সে নষ্ট করেছিল, তাদের কিছুই মেলেনি। জুলি বুঝতে পারে এটা শুধু এপস্টেইনের ব্যাপার নয়। এটা পুরো সিস্টেমের ব্যাপার, যারা তাকে রক্ষা করেছে। অবশেষে জুলি তার এডিটরকে স্টোরি টা জানায়।
এডিটরের অফিসে যায়, ২ ইঞ্চি
মোটা ফোল্ডার হাতে নিয়ে। এডিটর ওকে এমনভাবে দেখছিল যেন পাগল হয়ে গেছে। একজন এক বিলিয়নিয়ার আর এমন ঘটনার সাথে যুক্ত জুলি কিভাবে কি করবে? ইনশুরেন্সও কভার করতে পারবে না। জুলি ডকুমেন্টস, ইন্টারভিউ, ফ্লাইট লগ, পিএলআই ডিল সব তার সামনে রাখে। এডিটর একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলে,ঠিক আছে কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে। প্রতিটা ফ্যাক্টের তিনটা সোর্স থাকতে হবে। প্রতিটা অভিযোগের একটা এয়ারটাইট প্রুফ, একটা ভুল হলে সব শেষ তোমার ক্ষেত্রেও,জুলি রাজি হয় কিন্তু এখন সে খুব সাবধানে কাজ করছে। তার স্টোরির প্রতিটা বাক্য ল’ইয়াররা চেক করছে।
ও ভাবছিলো ও সতর্ক, কিন্তু জানতো না এপস্টেইনের লোকেরা তাকে আগেই লক্ষ্য করে ফেলেছে আর হামলা যেকোনো সময় শুরু হতে পারে। প্রথমে একটা ছোটো সতর্কবার্তা আসে অজানা একটা ইমেইল থেকে: “ড্রপ দ্য এপস্টেইন স্টোরি, ফাইনাল ওয়ার্নিং।” জুলি ভাবলো স্প্যাম, আর ডিলিট করে দিলো। কিন্তু তারপর তার বাড়ির বাইরে অদ্ভুত অদ্ভুত গাড়ি দেখা দিতে লাগলো। একটা কালো এসইউভি, প্রতিবার ভিন্ন ড্রাইভার নিয়ে, সবসময় তার বাড়ি থেকে তিনটা ঘর দূরে পার্ক করে থাকে। একদিন জুলির মেয়ে ভয়ে দৌড়ে ফিরে আসে, “মা, একটা লোক পুরো রাস্তা ধরে আমার পেছনে আসছে।”
কিছু বলেনি,শুধু দেখেই বারবার হাসছিল। জুলি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে কল করে। রিপোর্ট তো তৈরি হয়, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, আর তারপর একটা খুব খারাপ ঘটনা ঘটে। জুলির মেয়ে যে স্কুলে যায়,সেখান থেকে জরুরি কল আসে। জুলি পাগলের মতো স্কুলের দিকে দৌড়ে যায়। প্রিন্সিপালের অফিসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সে এক মহিলাকে দেখে, ব্লেজার পড়ে বসে আছে। ওই মহিলা সরাসরি চোখে চোখ রেখে বলে,এক অজানা রিপোর্ট অনুযায়ী আপনি আপনার মেয়েকে অবহেলা করছেন। প্লেট নাইটস( Place nights” বা হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে “Room nights” বলতে বোঝায় হোটেল বা আবাসে কাটানো রাতের সংখ্যা। এটি একটি পরিমাপক, যা বুক করা রুমের সংখ্যা এবং সেখানে কাটানো রাতের সংখ্যা গুণ করে বের করা হয় যেমন: ৩টি রুমে ২ রাত থাকলে ৬টি রুম নাইট)।বাড়িতে আসে, হয়তো আপনার কাজের আসক্তির কারণে আপনার মেয়ে অবহেলা পাচ্ছে।
রিপোর্টে তো ইমোশনাল সংবেদনশীলতার অভাব ও বলা আছে। কী? কারা এই রিপোর্ট আমার বিরুদ্ধে দিয়েছে?গোপন তথ্য অজানা হয়৷জুলি বলে ভুল বুঝেছো,দুই ঘণ্টা লাগবে প্রমাণ হয়ে যাবে যে সব কিছু মিথ্যা ছিল। বানানো ছিল আর শুধু ভয় দেখানোর জন্য। সোশ্যাল ওয়ার্কার সেখান থেকে চলে যায়। প্রিন্সিপাল ক্ষমা চায়। কিন্তু জুলির মেয়ে কেঁদে ওঠে। কিছু না বেবি, কেঁদো না। ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যায় কখনো কখনো৷
কিন্তু ভিতর থেকে সে জানে যে এপস্টেইন তার মেসেজ পাঠাচ্ছে যে আমি তোমার মেয়ের কাছে
পৌঁছাতে পারি। তারপর সেই রাতে জুলি’র এডিটরের কাছে ম্যানহাটন থেকে একটা বিশাল বড় ল’ ফার্মের কল আসে। তারা বলে, আমরা জেফরি এপস্টেইনকে রিপ্রেজেন্ট করি। তোমাদের একটা ভুল স্টেটমেন্ট হয়েছে আর আমরা তোমাদের নিউজপেপার এডিটর কে বিশেষ করে মিস ব্রাউনকে পার্সোনালি শোনাবো। রাত ১১টায় এডিটর জুলি’কে ফোন করে। সবাই জানে আমরা কী করছি। তারা কী করে জেনে গেল? জুলি বুঝে যায় অফিসের ভেতর থেকে লিক হয়েছে। এরপর সে অফিস যাওয়া বন্ধ করে দেয় আর বাসা থেকে কাজ করতে শুরু করে। কারো ওপরে বিশ্বাস করে না৷
আর যদি কোনো জরুরি কাজ থাকে তখন ই
অফিস যায়৷তাই সবাই ওর সাথে কথা বলা এড়িয়ে চলতো। কেউই এমন মেয়ের সাথে থাকতে চায় না যে এপস্টেইন নামের দানবের সঙ্গে ঝামেলা করেছে কিন্তু একজন সিনিয়র এডিটর জুলি’কে পাশে ডেকে বলে, জুলি, হয়তো এই স্টোরিটা করার দরকার নেই।একবার নিজের পরিবারের কথা ভাবো,তোমার মেয়ের কথা ভাবো। জুলির ওপর চাপ অসহনীয় হয়ে উঠছিল। ওর মনে হচ্ছিল, থেমে যাওয়াই ভালো কিন্তু জুলি আর থেমে থাকতে পারে না কারণ ভার্জিনিয়ার কথা ওর মাথায় গুঞ্জরিত হচ্ছিল—তুমি যদি থেমে যাও, ওরাই আবার জিতবে।
পরদিন জুলি আবার একটা স্টারবাকসে যায় (Starbucks স্টারবাকস হলো বিশ্বের বৃহত্তম আমেরিকান কফিহাউস চেইন, যা সিয়াটল থেকে যাত্রা শুরু করে। এই নামের উৎস হারমান মেলভিলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মবি ডিক’-এর প্রথম সাথী বা first mate ‘স্টারবাক’-এর নাম থেকে অনুপ্রাণিত । এর লোগোটি একটি পৌরাণিক মেরমেইড বা জলপরীর ছবি ৷)এক মেয়েকে ইন্টারভিউ নিতে যায়। ওই মেয়েটা তখন ১৫ বছর বয়সের ছিল, যখন এপস্টেইন তার ওপর অত্যাচার করেছিল। এখন সে দুই ছোট বাচ্চার মা আর অনেক বছর পর প্রথমবার কথা বলার জন্য প্রস্তুত। ইন্টারভিউ চলাকালীন মেয়েটার ফোন বেজে ওঠে। সেই স্ক্রিন দেখে তার মুখ সাদা হয়ে যায়। ফোনটা জুলির সামনে রেখে দেয়। অজানা নম্বর থেকে একটা মেসেজ আসে, সঙ্গে একটা ছবি লাগানো ছিল, যেখানে ওই মেয়েটার দুই ছোট মেয়ে প্লেগ্রাউন্ডে খেলছে। মেয়েটার নিঃশ্বাস আটকে যায়। সে তার পার্সটা ধরে, আর কফির দিকে তাকায়।
পড়ে যেতে যেতে সে স্টারবাক থেকে বেরিয়ে যায়। একটাও কথা না বলেই। জুলি পুরোপুরি নীরব হয়ে বসে থাকে। এটা বুঝতে পারে যে এপস্টেইন শুধু তাকে দেখছে না। সে প্রতিটি মানুষকে দেখছে যার সাথে সে কথা বলে। জুলি বুঝে যায় যে এটা একটা রেস। তাকে পাবলিশ করতে হবে তাকে থামিয়ে দেওয়ার আগে কিন্তু তার এডিটর প্রস্তুত নয়। ল’ইয়ার সন্তুষ্ট নয়। তাদের আরও কনফার্মেশন এবং ডকুমেন্টেশন দরকার,আর সময় দরকার,আর সময়ই জুলির কাছে একদম নেই কিন্তু তারপর ২০০৫ পাম বিচ ইনভেস্টিগেশনের একজন ডিটেকটিভ জুলির কাছে আসে।
বেনামী এনক্রিপ্টেড ইমেইলের মাধ্যমেই কো রিচ আউট করে। জুলি তার সাথে রাতে একটা পার্কিং গ্যারেজে দেখা করে। সে তাকে একটা ফ্ল্যাশ ড্রাইভ দেয়। ফ্ল্যাশ ড্রাইভে ছিল বিস্ফোরক প্রমাণ। ভিকটিমের বিবৃতি ছিল যেখানে শক্তিশালী কিছু লোকের নাম ছিল যারা ওই মেয়েদের এপস্টেইনের প্রপার্টিতে নির্যাতন করেছিল। পুলিশ রিপোর্ট ছিল যাতে বলা ছিল রিক্রুটাররা মেয়েদের নিয়ে আসছিল আর এপস্টেইন তাদের নির্যাতন করছিল। গিলিয়ান ম্যাক্সওয়েল সবকিছু সমন্বয় করছিল। ইন্টারনাল মেমো ছিল যেগুলো দেখাচ্ছে কিভাবে এপস্টেইনের আইনজীবী আর তার শক্তিশালী কানেকশনদের চাপের কারণে
তদন্ত বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রমাণগুলো কখনোই গ্র্যান্ড জুরি’র সামনে উপস্থাপন হয়নি। জুলি’র কাছে অবশেষে সবকিছু এসে গেছিল যা তার দরকার।তখন সে ঠিক করে সে নিজেই সব কিছু প্রকাশ করবে। কিন্তু যখন সে নিউজপেপারের সার্ভারে ঢুকতে চায় ডকুমেন্ট আপলোড করার জন্য, তার লগইন কাজ করছিল না। সে আইটি গ্রুপে ফোন করে। তারা বলে, তাদের জানা নেই কেন এমন হচ্ছে। সে তার এডিটরকে ফোন করে বলে কেউ আমাকে লগআউট করে দিয়েছে।এডিটর বলে জুলি অফিসে এসো এখনই। জুলি সকাল ৬টায় তার নিউজরুমে আসে।
তার এডিটর, ম্যানেজিং এডিটর,
নিউজপেপারের ল’ইয়ার তিনজনেই ওখানে ছিলেন। জুলি কে বলল, আমরা এই তদন্তটা থামাচ্ছি। কি? আমরা বিশ্বাসযোগ্য আইনি হুমকি পেয়েছি আর আমাদের ইনস্যুরেন্স কোম্পানি সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ কভার করবে না,বোর্ড নার্ভাস হয়ে পড়েছে। আমাদের এখন সব কিছু এখানেই থামাতে হবে। স্যার, থামানোর মানে এই স্টোরিটা শেষ করে দেওয়া। আমার কাছে সবকিছু আছে। ভিকটিমরা, ডকুমেন্টস, প্রমাণ, আমরা মামলা জিততে পারি।তারা বললো মিস ব্রাউন, জেফরি এপস্টেইমের কাছে সীমাহীন রিসোর্স আছে। সে আমাদের দুর্বল করে দেবে। আমরা জিতলেও হারব।
জুলি তার এডিটরকে দেখে। সেই মানুষটাই যিনি ইনভেস্টিগেশন নিজেই অনুমোদন করেছিলেন। সে জুলির সাথে চোখ মিলায় না। জুলি বাইরে চলে যায়। তার ল্যাপটপ, তার ফাইলগুলো নিয়ে।প্রচন্ড রাগে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরে যায় সে। সে তার রান্নাঘরের কাছে বসে ছিল।সব ডকুমেন্টে নিয়ে এবং বুঝতে পারে তারা তাকে ভেঙে দিয়েছে। এপস্টেইন জিতে গেছে,তার মেয়ে তাকে কাঁদতে দেখে। জুলি তার মেয়েকে দেখে। পনেরো বছরের মেয়ে, এপস্টেইনের সব ভিকটিমদের মতো একই বয়সের মেয়ে, এবং অনুভব করে যদি তার মেয়ের সাথেও এমন কিছু ঘটে,
যদি এমন কিছু হতো, তাহলে সে হয়তো কিছুই করতে পারত না।
হয়তো ওরা ঠিক বলেছিল। হয়তো কিছু রাক্ষসকে কখনো মারা যায় না। সে অবশেষে সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবে এবং নিজের বাকি জীবন বাঁচানোর ব্যাপারে চিন্তা করে। সেই রাতে কয়েক সপ্তাহ পরে প্রথমবার তার মেয়েকে আলিঙ্গন করে এবং ঘুমিয়ে পড়ে,পরের দিন সে অফিসে যায়। সবাই বুঝে যায় যে সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু জুলি ছেড়ে দেয়নি। বরং সে গোপনে কাজ করে। তার সম্পাদক ভাবে যে ওই তদন্ত শেষ হয়ে গেছে৷
এবং সে হয়তো কাউকে খুঁজে নেবে যে তার আর্টিকেল প্রকাশ করবে৷জুলির আর্টিকেল পত্রিকায় প্রকাশ না হওয়ার পর সে নিজেই খুঁজে নেয় যিনি তার আর্টিকেল পাবলিশ করবেন, তারপর সে ব্রাডলি এডওয়ার্ডস আর পল ক্যাসেল-এর কাছে পৌঁছায়। এরা সেই আইনজীবীরা, যারা এপস্টেইনের ভিকটিমদের হয়ে এক দশক ধরে হাই-পাওয়ার্ড অ্যাটর্নির ফৌজের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তারা তখনও খুঁজছিলেন এমন একজন সাংবাদিককে, যিনি পুরো স্টোরি বলার জন্য প্রস্তুত থাকবেন। তারা তাকে সিলড ডকুমেন্টস দেয়। এমন প্রমাণ যা গোপনে লুকানো ছিল। জুলি পুরো দেশজুড়ে এপস্টেইনের ভিকটিমদের সাথে যোগাযোগ করে। একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করে সব মহিলাদের নিয়ে যারা একবার একে অপরের সঙ্গে দেখা করেনা শুধু,তারা একে অপরের সাথে তাদের কিন্তু সেম নাইট মেয়ার শেয়ার করে আর তা অন রেকর্ড বলার জন্য কনভিন্স করে।
টাকার জন্য নয়, খ্যাতির জন্যও নয়, বিচারের জন্য। ভয় সত্বেও আর ট্রমা সত্বেও। জলি অপরিহার্য প্রমাণ সংগ্রহ করে ফেলে। ফ্লাইট লগ, ফোন রেকর্ড আর পার্টির ছবি যা অ্যাপস্টেইনকে আরও অনেক শক্তিশালী পুরুষদের সঙ্গে দেখা যায়। স্টোরি রেডি, এয়ারটাইট, এক্সপ্লোসিভ। এখন সে সেই ভিত রিপোর্টার নয় যে ঝগড়া থেকে দূরে থাকত, ও এখন বিপজ্জনক হয়ে গেছে। সে একবার শেষবারের মতো এডিটরের কাছে যায় আর বলে আমি এই স্টোরি পাবলিশ করছি।
তোমার সাথে বা তোমাকে ছাড়া, তুমি না করলে আমি এটা নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ানকে দেব। কিন্তু এই স্টোরি আসছে।এডিটার তার চোখের মধ্যে এক আগুন দেখে। এটা সেই জুলি নয় যাকে সে ১৫ বছর ধরে চিনত। সে ম্যানেজিং এডিটরকে ফোন করে। তারপর পাবলিশারকে ফোন করে। ৬ ঘণ্টার মিটিং হয়। তারপর অবশেষে সে জুলির অফিসে যায়। আমরা এই স্টোরি চালাচ্ছি। কিন্তু যদি ব্যাপারটা খারাপ হয়, তাহলে দায় তোমার। জুলি তার চোখে চোখ রেখে বলে, আমি জানি ২৮ নভেম্বর ২০১৮ মিয়ামি হেরাল্ড নিউজপেপার।
“পারভর্জন অফ জাস্টিস নামে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল কীভাবে বছরের পর বছর জেফ্রি এপস্টেইন মেয়েদের শোষণ করেছিল আর সরকার নিজেই তাকে রক্ষা করেছিল। এই রিপোর্টের রেসপন্স ছিল একদম তাৎক্ষণিক আর প্রচন্ড। মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে এটা টুইটারে নম্বর ওয়ান ট্রেন্ড করছিল। ৬ ঘণ্টার মধ্যে বড় বড় নিউজ নেটওয়ার্কগুলো এটা কভার করছিল আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফেডারেল প্রসিকিউটররা তাদের স্টেটমেন্ট দিচ্ছিল, ‘আমরা এই বিষয়টি পুনরায় যাচাই করছি।’ এরপর থেকে এপস্টেইনের বেঁচে থাকা ভিকটিমরা ধীরে ধীরে সবাই সামনে আসতে শুরু করল।
প্রায় ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবার এমনটা হলো যখন নারীরা ভাবছিলেন যে তারা একাই ছিল, তখন বুঝতে পারে তার মতো আরও অনেকেই আছে আর এফবিআই নতুন একটা তদন্ত শুরু করে। কংগ্রেস ২০৮ নম্বর করাপ্ট পলি ডিলের ওপর হিয়ারিং চায়। অ্যালেকজান্ডার অকোস্টা, সেই প্রসিকিউটার যিনি এপস্টেইনকে সুইটহার্ট ডিল দিয়েছিলেন, যিনি এখন ট্রাম্পের লেবার সেক্রেটারি, তার ওপর পদত্যাগের চাপ তৈরি হতে থাকে কারণ সে একজন পিটাইল বিলিয়নিয়ারকে ফ্রি পাস দিয়েছিল। প্রিন্স অ্যান্ড্রুর এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব একটা আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি হয়ে ওঠে আর এখন এপস্টেইনের দল ফিরে আক্রমণ চালাচ্ছে। তার আইনজীবীরা জরুরি মোশন জমা দেয়।
প্রমাণ চাপানোর জন্য আর কোর্টের ডকুমেন্ট সিল করানোর জন্য। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটররা জুলির অতীত খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে। তার ফাইন্যান্স, সম্পর্ক, পরিবার—সবকিছু খুঁজে বের করে যা দিয়ে তাকে অপমান করা যায়। কেউ কেউ সার্ভাইভার মেয়েদের মিথ্যাবাদী, গোল্ড ডিগার, সুযোগসন্ধানী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে, যেন বছরের পর বছর পর টাকার জন্য এসেছে। জুলিকে প্রতিদিন মারার হুমকি দিতে থাকে। বিস্তারিত হুমকিতে লেখা থাকে তারা তার সঙ্গে আর তার মেয়ের সঙ্গে কী কী করবে।
ভার্জিনিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ করা হয়। তার পুরানো ছবি ব্যবহার করে তাকে অপমান করা হয়। একজন বেঁচে থাকা মেয়েকে এত হুমকি দেওয়া হয় যে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে বসে। ব্যবস্থা আবারও তাদের ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু এবার তারা ভাঙবে না কারণ এবার তারা একা নয়। কিন্তু তারপর কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটে। অন্য সাংবাদিকরাও টাইমস, পোস্ট, গার্ডিয়ান, সিএনএন, বিবিসির কাছে ফোন করতে শুরু করে এবং বলে যে আমরা ফলো আপ তদন্ত চালাচ্ছি।
আমরা এই মামলাকে চাপা পড়তে দেবো না এবং তারপর কিছু আইনজীবী জুলিকে ফ্রি-তে সাহায্য করার প্রস্তাব দেয়। বেঁচে থাকা মেয়েরা অনলাইনে যুক্ত হয়। একটা আন্দোলন গড়ে তোলে—জাস্টিস ফর এপস্টেইন’স ভিকটিমস। এপস্টেইন জুলিকে ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু জুলি তার নিজের একটা টিম তৈরি করে ফেলেছিল। তারপর ৬ই জুলাই, ২০১৯ সব কিছু বদলে যায়। জেফরি এপস্টেইন নিউ জার্সির টাটার বোরো এয়ারপোর্টে গ্রেফতার হন। প্যারিস থেকে প্রাইভেট জেট নিয়ে ফেরার সময় বিমান থেকে নামার আগেই তার প্লেনে ঢুকে তাকে মাইনর trafficking আর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।
চার্জ ছিল ওর বিরুদ্ধে,ফেডারেল চার্জ, যা ওকে ৪৫ বছর জেলে পাঠাতে পারে। জুলি তার মেয়েকে স্কুলে ছেড়ে দিতে যাচ্ছিল। তখন তার ফোনে ওই খবরের অ্যালার্ট আসে। সে গাড়ি সাইডে দাঁড় করায়। তার মুখে শুধু চোখের জল রইল। তার মেয়ে ওকে দেখে জিজ্ঞেস করে, “মা, কী হয়েছে?” জুলি কিছু বলে না, শুধু ফোনটা দেখায়। ১৪ বছর পর অবশেষে জেফরি এপস্টেইন ধরা পড়ল। আর এই সব সম্ভব হলো শুধু ওই নারীদের কারণে, তাদের সাহসের কারণে, তাদের কণ্ঠস্বরের কারণে, আর তাদের চুপ না থাকার কারণে,জিদের কারণে।
জেফরি এপস্টেইনের জামিন নামঞ্জুর হয়ে যায়। এতো রিসোর্স, এতো কানেকশন থাকা সত্ত্বেও সে ম্যানহাটনের জেলে বসে আছে। প্রথমবারের মতো বছরের পর বছর জেফরি এপস্টেইন পালাতে পারছে না। সারভাইভার মেয়েরা এমন একটা অনুভূতি পাচ্ছে যা তারা বছরের পর বছর কখনো অনুভব করেনি। আর সে অনুভূতিটা হলো আশা।ভাবলো হয়তো, ন্যায়বিচার সম্ভব। ভার্জিনিয়া জুলিকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমরা করে দেখিয়েছি। আমরা সত্যিই করে দেখিয়েছি। জুলি তার কণ্ঠস্বর শুনে মাটিতে বসে পড়ে। ১৮ মাসের পরিশ্রম আর ভয়ের বোঝা হঠাৎ করে কমে গিয়েছিল৷
কিন্তু এই সব রিলিফ ছিল সাময়িক। ১০ আগস্ট ২০১৯, সকাল ৬:৩০ টায় জুলি সকালে উঠে তার ফোনে ৪৭টা মিসড কল দেখে। তারপর সে নিউজ চালায় আর তার পায়ের তলা থেকে জমি সরে যায়। ব্রেকিং নিউজ রাইট নিউজ: জেফরি এপস্টেইন নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে। মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারের সেলে জেফরি এপস্টেইনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। নিউজের কথাগুলো একদম বোধগম্য নয়। এপস্টেইন তার সেলে লুটিয়ে পড়ে ছিল। সে স্যুইসাইড ওয়াচে ছিল, মানে তার ওপর নজর রাখা হচ্ছিল যাতে সে আত্মহত্যা না করে। কিন্তু পরে তাকে স্যুইসাইড ওয়াচ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
গার্ডদের প্রতি ৩০ মিনিটে চেক করতে হত কিন্তু এইবার ওরা করলো না। সিকিউরিটি ক্যামেরাগুলো মালফাংশন হয়ে গেছিলো। ওর সেলমেট একদিন আগে অন্য কোথাও ট্রান্সফার হয়ে গিয়েছিল। জলির ফোন কল শুনে সবার যেন বিস্ফোরণ হয়। সারভাইভাররা, লইয়াররা, রিপোর্টাররা সবাই একই প্রশ্ন করছিলো, কিভাবে? আমেরিকার সবচেয়ে হাই প্রোফাইল বন্দী যে এমন চার্জের মুখোমুখি ছিল যা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী লোকদের উন্মোচন করতে পারত। একটা ফেডারেল জেলে কিভাবে মারা গেল? ভার্জিনিয়া টুইট করে, আমরা আবার ধর্ষিত হয়েছি। কোটনি পোস্ট করে, সে কভার করেছে কিভাবে এটা হলো?আমরা কখনো ভুলব না।
উত্তরটা পেতে হবে। আরেকজন সারভাইভার লিখছে, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কেউ আমাকে বলুক। ইন্টারনেটে কনস্পিরেসি থিওরিগুলো ছড়াতে শুরু করে। কিছু ভাবনাযোগ্য, কিছু একদম বাজে। কিন্তু সব একটাই কারণে আসছিল। আর সেই কারণ হলো কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, একজন বিলিয়নিয়ার যার কাছে প্রেসিডেন্ট আর প্রিন্সের গোপন রহস্য রয়েছে, সে কিভাবে দুর্ঘটনাবশত মারা গেল? জুলি তার রান্নাঘরে বসে ছিল। ভেঙে পড়েছিল। এত সব ঘটার পর হুমকি, ভয়, ১৮-১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম, সারভাইভার মেয়েদের সাহস আর কিনা সেই রাক্ষস পালিয়ে গেল! কোনও ট্রায়াল হয়নি, কোনও সাক্ষ্য প্রমাণ মিলেনি। জনসাধারণের সামনে কিছুই আসেনি।
শেষ সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু তারপর ওর ফোন আসে। কল ছিল ভিকটিমদের পক্ষ থেকে একজন আইনজীবীর। জুলি বলল, এটা শেষ হয়নি। এপস্টেইমের বিরুদ্ধে চার্জ ড্রপ হতে পারে, কিন্তু তদন্ত চলতেই থাকবে। গিলান, ম্যাক্সওয়েল আর যারা ওদের সাপোর্ট করছে, আমরা ওদের সবাইকে ধরতে যাচ্ছি। জুলি বুঝতে পারে, এপস্টেইনের সঙ্গে স্টোরি শেষ হয়নি। এটা তো এখন সবে শুরু হয়েছে। সে সেই নেটওয়ার্ককে উন্মোচন করে যেটা এপস্টেইনকে বহু বছর চলতে দিয়েছে।
গিলান ম্যাক্সওয়েল, ব্রিটিশ সোশ্যালাইট যিনি এপস্টেইনের
মেয়েদেরকে রিক্রুট এবং নির্যাতন করতো। সে ইউরোপ বা নিউ ইংল্যান্ডের কোথাও লুকিয়ে ছিল। কোনো ধনী পরিবারের প্রোটেকশনে থাকা আইনজীবীরা,যারা কোরাপ্ট প্লি ডিল নেগোশিয়েট করেছিল, যার মধ্যে এলেন ডাশভিচও ছিল, যাকে এখন এক ভিকটিম অভিযোগও করছে। বড় বড় সায়েন্টিস্ট এবং একাডেমিক যারা এপস্টেইন থেকে টাকা নিয়েছে তাকে সম্মান দেওয়ার জন্য। ব্যাংকগুলো যারা ট্রানজাকশন প্রসেস করেছিল। একাউন্ট্যান্টরা যারা তার সম্পদ লুকিয়েছিল। পাইলটরা যারা প্লেন চালিয়েছিল এবং স্টাফরা যারা সব দেখেছিল কিন্তু কিছুই ভুলে যায়নি।
আর যারা ক্ষমতাশালী,
যাদের নাম ফ্লাইট লগ এবং ভিজিটর রেকর্ডে ছিল, তাদের মধ্যে আমি একজন। তদন্ত শুধু একটা মনস্টার থেকে শুরু হয়ে এই পুরো ষড়যন্ত্রের সিস্টেম পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং বেঁচে থাকা মেয়েগুলো তদন্ত থামতে দেয় না। তারা কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দেয়। তারা ইন্টারভিউ দেয়, মেমো লিখে। অন্য বেঁচে থাকা মেয়েদের সাহায্যের জন্য ফাউন্ডেশন তৈরি করে। তারা ভিকটিম থেকে ওয়ারিয়ারে পরিণত হয়। ২ জুলাই, ২০২০, এফবিআই এজেন্টরা গিলিয়ান ম্যাক্সওয়েলকে নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক নির্জন ম্যানশনে গ্রেফতার করে, যেখানে সে প্রায় এক বছর ধরে লুকিয়ে ছিল।
সে সেক্স ট্রাফিকিং, মাইনরদের সঙ্গে অপরাধে জড়িত, প্রতারণা আর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ট্রায়াল নভেম্বর ২০২১-এ শুরু হয়। বেঁচে থাকা মেয়েরা সাক্ষ্য দেয়। এপস্টেেইন নিয়ে নয়, যিনি মারা গেছেন, গিলানের ব্যাপারে। তারা বর্ণনা করে কিভাবে সে তাদের মডেলিং, পড়াশোনা, মেন্টরশিপের আশ্বাস দিয়ে রিক্রুট করেছিল। সে তাদের বিশ্বাস করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। যেন সে তাদের বন্ধু বা মা’র মতো একজন ফিগার ছিল।তখন এই ভাবনাকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছিল,মেয়েদের এতে অংশগ্রহণ করানো হয়েছিল। তাদের এমন অনুভূতি দেওয়া হত যেন এটা পুরোপুরি স্বাভাবিক কিছু। তারা যখন ওখান থেকে বেড় হওয়ার চেষ্টা করতো তখন তাদের হুমকি দেওয়া হত
ভয় দেখিয়ে আর মানিপুলেশন করে।
জুরি তাদের গল্প শুনল আর ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে গিলিয়ান ম্যাক্সওয়েলকে মাইনরদের সেক্স ট্রাফিকিংয়ের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। তাকে ২০ বছরের ফেডারেল কারাদণ্ড দেয়া হয়। কোর্টরুম একেবারে ফেটে পড়ে। বেঁচে থাকা মেয়েগুলো কাঁদছিলো। একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিলো। কিন্তু এই লড়াই এখনও শেষ হয়নি। অন্য দোষীরা আজও ফ্রি ঘুরে বেড়াচ্ছে। শক্তিশালী মানুষরা আজও আইনজীবী আর নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের আড়ালে লুকিয়ে আছে৷
সেই সিস্টেম যা এপস্টেইনকে প্রোটেক্ট করেছিল, সে আজও আছে। কিন্তু সারভাইভাররা লড়াই চালিয়ে যায় আর জুলি লিখতেই থাকে। জুলি নিউইয়র্কে পুলিৎজার সেরেমনীতে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিংয়ের জন্য পুরস্কার গ্রহণ করছিলো। রুমটা অন্য সাংবাদিক, এডিটর, পাবলিশারদের ভিড়ে ভরে ছিল। যারা তার স্টোরিটাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছিলো। কিন্তু সেখানে জুলি নিজের কথা বলেনা। সে সারভাইভার মেয়েদের কথা বলে। কোটনি ওয়াইল্ড, মিশেল লিকাটা, ভার্জিনিয়া আর আরও কত মেয়েরা যাদের নাম হয়তো আমরা কখনো জানতেও পারবো না।
জুলি বলেছিলো আমি জেফ্রি এপস্টেইনকে হারাইনি, বরং ওই মেয়েরা তাকে হারিয়েছে। তারা চুপ থাকার বদলে ভয়কে পরাজিত করে সাহস জোগায়, বিশ্বাস করে যে ন্যায়বিচার হয়তো দেরিতে বা অসম্পূর্ণ হতে পারে, তবুও লড়াই করে যেতে হয় আর যখন মেয়েরা ভয় পাওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন সবচেয়ে বড়রাও হার মেনে যায়।