ভারতবর্ষ তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্যবার বাইরের শক্তির সংস্পর্শে এসেছে। কখনো তা ছিল সামরিক অভিযান, কখনো বাণিজ্যিক লেনদেন, আবার কখনো বা মতাদর্শগত আদান-প্রদান। তবে আধুনিক যুগে ভারতের সামনে যে সংকটটি প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো ‘সমাজতাত্ত্বিক মতবাদ’ বা ‘Sociological Doctrine’-এর নির্বিচার আমদানি। সমাজবিজ্ঞান কেবল একটি অ্যাকাডেমিক বিষয় নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সামাজিক বুনন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি নির্ধারণ করে। বর্তমান সময়ে ভারত এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য ভারতের নিজস্ব সামাজিক সত্যকে আড়াল করে দিচ্ছে।ভারত বর্তমানে বিদেশি সমাজতাত্ত্বিক মতবাদ, সক্রিয়তা (activism), এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি বড় মাপের অনুপ্রবেশের শিকার। এই আমদানিকৃত তত্ত্বগুলো প্রায়শই ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ জটিলতা এবং হাজার বছরের বিবর্তনকে অস্বীকার করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভারতের প্রশাসনিক ও শিল্পজগতের অভিজাত শ্রেণীর বেশীর ভাগ মানুষ এই বিদেশি চিন্তাধারাকে আধুনিকতার মোড়কে গ্রহণ করছে এবং প্রভাবিত হচ্ছে। এটি কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়, বরং একটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। যখন কোনো সমাজ তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার পরিবর্তে বিদেশি চশমা দিয়ে নিজেকে দেখতে শুরু করে, তখন তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় ফাটল ধরা স্বাভাবিক।
আর্য-দ্রাবিড় তত্ত্ব: একটি ঐতিহাসিক বিপর্যয়
ভারতের সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনে বিদেশি হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ‘আর্য-দ্রাবিড় বিভাজন’ তত্ত্ব। উনিশ শতকে ইউরোপীয় পণ্ডিতরা ভাষাভিত্তিক মিল ও অমিলের ওপর ভিত্তি করে এই তত্ত্বটি প্রচার করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে একটি কৃত্রিম বংশগত ও জাতিগত বিভাজন তৈরি করা।
এই তত্ত্বটি কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, পাঠ্যপুস্তক এবং গণমাধ্যমে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, আজ এটি দক্ষিণ ভারতের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও আধুনিক ডিএনএ (DNA) গবেষণা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো এই দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছে, তবুও রাজনৈতিক স্বার্থে এই বিভাজনকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, একবার কোনো বিদেশি ভ্রান্ত ধারণা যদি কোনো জাতির মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তবে তা থেকে মুক্তি পাওয়া কতটা কঠিন। আজ যারা এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেন, উল্টো তাদেরই প্রমাণের দায়ভার নিতে হয়।
বর্ণ ও জাতির ঐতিহ্য বনাম ‘Caste’-এর ঔপনিবেশিক রূপ
ভারতীয় সমাজের মেরুদণ্ড হলো ‘বর্ণ’ (Varna) এবং ‘জাতি’ (Jati)। ঐতিহাসিকভাবে এই ব্যবস্থাগুলো ছিল অত্যন্ত নমনীয় (fluid) এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন।
বর্ণ ও জাতি: প্রাচীন ভারতে বর্ণ ছিল একটি গুণ ও কর্মভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং জাতি ছিল একটি সামাজিক গোষ্ঠী বা পেশাগত পরিচয়। সমাজবিজ্ঞানী এম. এন. শ্রীনিবাস দেখিয়েছেন যে, ভারতের নিম্নবর্ণের মানুষরা ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক সোপানে উপরে ওঠার চেষ্টা করত, যাকে তিনি ‘সংস্কৃতায়ন’ (Sanskritization) বলেছেন। অর্থাৎ, এই কাঠামোটি কখনোই পাথর চাপা দেওয়া বা অনড় ছিল না।
কাস্ট (Caste) শব্দের অনুপ্রবেশ: ‘Caste’ শব্দটি বাংলা বা সংস্কৃত নয়। এটি পর্তুগিজ শব্দ ‘Casta’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বংশ’ বা ‘বিশুদ্ধতা’। ইউরোপীয়রা যখন ভারতে এল, তারা তাদের নিজেদের সামন্ততান্ত্রিক অভিজ্ঞতা দিয়ে ভারতের বর্ণ ও জাতি ব্যবস্থাকে বুঝতে চাইল। তারা একে একটি অনড় ও শোষক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করল।
ব্রিটিশ আদমশুমারির ভূমিকা: ১৯০১ সালের হার্বার্ট রিজলির নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ আদমশুমারি ভারতীয় সমাজতত্ত্বের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ব্রিটিশরা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য কয়েক হাজার নমনীয় ‘জাতি’কে কয়েকটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে ভাগ করে দিল। এর ফলে সামাজিক নমনীয়তা শেষ হয়ে গেল এবং মানুষ তাদের পরিচয়ের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ল। আজ আমরা যে ‘কাস্ট পলিটিক্স’ দেখি, তার বীজ বপন করা হয়েছিল ওই ঔপনিবেশিক আদমশুমারির মাধ্যমেই।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
আজকের দিনেও এই একই প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে নতুন নতুন সমাজতাত্ত্বিক ‘ডিসকোর্স’ ভারতে আসছে। এগুলোর পেছনে রয়েছে বিশাল ফান্ডিং এবং গ্লোবাল নেটওয়ার্ক। এই নতুন মতবাদগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে নষ্ট করার সম্ভাবনা রাখে। লেখক এখানে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা লাল সংকেত দেখাচ্ছেন এই কারণে যে, যদি আমরা এখনই আমাদের নিজস্ব সমাজতাত্ত্বিক সংজ্ঞা (Indigenious definitions) তৈরি করতে না পারি, তবে ভারত আবার একটি নতুন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশে পরিণত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান কোনো নিরপেক্ষ বিজ্ঞান নয়; এর পেছনে অনেক সময় রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। ভারতকে যদি তার অখণ্ডতা বজায় রাখতে হয়, তবে তাকে বিদেশী ‘ইম্পোর্টেড’ তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। ‘আর্য-দ্রাবিড়’ বা ‘Caste’-এর মতো ভুল ধারণাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের ইতিহাস এবং সমাজকে নিজস্ব মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে। বিদেশী মতবাদের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং ভারতীয় সমাজের মূল সুরটি খুঁজে বের করাই হোক বর্তমান প্রজন্মের লক্ষ৷একটি জাতির সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুদণ্ড নির্ভর করে তার নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর। কিন্তু ভারতের আধুনিক ইতিহাসে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন বিদেশি তত্ত্ব ও মতবাদ এ দেশের সমাজকাঠামোকে বারবার পুনর্গঠন বা প্রভাবিত করেছে। এই আমদানিকৃত চিন্তাগুলো অনেক সময় ভারতের স্বাভাবিক ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করে কৃত্রিম বিভেদ তৈরি করেছে।
ঔপনিবেশিক শাসন ও বর্ণবাদের প্রবর্তন
ব্রিটিশ শাসনের একটি অন্যতম কৌশল ছিল ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি। ১৮৭১ সালের পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা ভারতের প্রাচীন ও নমনীয় সামাজিক বিন্যাসকে ভেঙে দিয়ে এক কঠোর বর্ণবাদী ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। আর্য তত্ত্বের মতো বিদেশি ধারণাগুলো জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ও হীনম্মন্যতার বীজ বপন করা হয়েছিল। শুরুতে ভারতের সাধারণ মানুষ এবং বুদ্ধিজীবীরা এর প্রতিবাদ করলেও, সময়ের আবর্তে এই আরোপিত ব্যবস্থাই সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর এই বিভেদ দূর করার পরিবর্তে তা আইনের মাধ্যমে আরও দৃঢ় ভিত্তি পায়, যা আজ অবধি সমাজে বিভাজনের একটি বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
বিদেশি মতাদর্শের অনুপ্রবেশ ও রূপান্তর
ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে গত কয়েক দশকে মার্ক্সবাদ ও পশ্চিমা বিভিন্ন তত্ত্বের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। শুরুতে ‘উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদ’ বিদেশি শাসকদের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের একতাবদ্ধ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ‘নিম্নবর্গীয় তত্ত্ব’ বা ‘সাবঅল্টারনিজম’-এর মতো মতবাদগুলো সেই লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই নতুন তত্ত্বগুলো বিদেশি শত্রুর পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরীণ বর্ণ বা গোষ্ঠীগুলোকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। শোষক এবং শোষিত—এই দুই মেরুতে সমাজকে ভাগ করার ফলে ভারতের নিজস্ব ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার পথ ধরে জন্ম নিয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘু রাজনীতি।
প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
এই বিদেশি তত্ত্বগুলো কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, ইতিহাস লিখন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণেও এগুলো স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে। এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ বিদেশের জনপ্রিয় বা আধুনিক তত্ত্বগুলো বিনা বিচারে গ্রহণ ও প্রয়োগ করতে পছন্দ করেন। এর ফলে শিক্ষা ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমন এক মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যা ভারতের নিজস্ব চিন্তাচেতনা বা দেশীয় সমাধানকে অবজ্ঞা করে বিদেশি কাঠামোকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে।
আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও অস্থিতিশীলতা
বর্তমান সময়ে এই বৈচিত্র্যময় বিভেদ সৃষ্টিকারী মতবাদগুলো কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করছে আন্তর্জাতিক স্তরের বিশাল অর্থায়ন, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং বহুজাতিক আইনি ব্যবস্থা। এই আধুনিক বাস্তুতন্ত্র এতটাই শক্তিশালী যে, বিশ্বের কোনো এক প্রান্তের সামান্য একটি ঘটনাকেও ব্যবহার করে এরা ভারতের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই অপপ্রচারগুলো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সহিংসতা উসকে দিতে প্ররোচনা দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, বিদেশি জ্ঞান বা তত্ত্ব গ্রহণ করা দোষের কিছু নয়, কিন্তু যখন সেই জ্ঞান কোনো জাতির নিজস্ব ঐক্য নষ্ট করে বিভাজন তৈরি করে, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের সমাজকে পুনরায় একতাবদ্ধ করতে হলে আমদানিকৃত এই বিভেদমূলক তত্ত্বগুলো থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে নতুনভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। বিদেশি শক্তির স্বার্থ ও বুদ্ধিজীবীদের মায়া কাটিয়ে একটি স্বনির্ভর ও সংহতিপূর্ণ ভারত গড়াই হোক বর্তমান সময়ের মূল লক্ষ্য।