ব্রেকিং ইন্ডিয়া ১.০ বনাম ব্রেকিং ইন্ডিয়া ২.০
নিচে ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রভাব বিস্তারের দুটি ভিন্ন পর্যায়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:
ব্রেকিং ইন্ডিয়া ১.০ (পুরানো রূপ) ব্রেকিং ইন্ডিয়া ২.০ (নতুন রূপ)
আদর্শিক কাঠামো: এটি মূলত বামপন্থী মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে চলত। আদর্শিক কাঠামো: বর্তমানে ‘সিআরটি’ (CRT) কাঠামো ব্যবহার করে ভারতীয় বিভিন্ন শোষিত গোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে।
টার্গেট: গ্রামের দরিদ্র মানুষদের ধর্মান্তরিত করা বা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করাই ছিল মূল লক্ষ্য। টার্গেট: শহরের উচ্চশিক্ষিত সমাজ, যারা শিল্প, প্রশাসন বা সরকারি উচ্চপদে আসীন, তাদের লক্ষ্য বানানো হচ্ছে।
ঘোষিত লক্ষ্য: অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও পানীয় জলের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। ঘোষিত লক্ষ্য: হার্ভার্ডের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি ও নেতৃত্বের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নতির স্বপ্ন দেখানো।
সংযোগ: সাধারণ মানুষরা বৈশ্বিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং পাশ্চাত্যের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। সংযোগ: হার্ভার্ডে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভারতীয় মধ্যস্থতাকারীরা এখন জ্ঞান আদান-প্রদানের মাধ্যমে সব স্তরে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
অর্থায়নের নেপথ্য কারণ
ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, অনেক ধনকুবের মানবকল্যাণে বিপুল অর্থ দান করেছেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে মাঝে মাঝে এই দান বা সমাজসেবার আড়ালে কিছু অপ্রত্যাশিত ফলাফল বেরিয়ে আসে।সেইসব প্রকল্পের পেছনের উদ্দেশ্যগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া হয়, সেগুলোর ওপর আলোকপাত করা দরকার। যারা এই প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করছেন, তারা হয়তো ভালো উদ্দেশ্যেই করছেন, কিন্তু এর ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পরিশেষে, প্রশ্নটি থেকেই যায়—কেন এই কোটিপতিরা হার্ভার্ডের মতো জায়গায় এই ধরনের বিশেষ কার্যকলাপে অর্থ ঢালছেন? যদিও এর একাধিক সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে, তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
ব্রেকিং ইন্ডিয়া ১.০ বনাম ব্রেকিং ইন্ডিয়া ২.০
ভারতের অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জকারী শক্তির বিবর্তনকে লেখক দুটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন:
বৈশিষ্ট্য ব্রেকিং ইন্ডিয়া ১.০ (পুরানো সংস্করণ) ব্রেকিং ইন্ডিয়া ২.০ (নতুন সংস্করণ)
আদর্শিক ভিত্তি মূলত সনাতন বা পুরানো বামপন্থী চিন্তাধারা। ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি (CRT)-এর আদলে তৈরি ‘ভারতীয় শোষিত গোষ্ঠী’ তত্ত্ব।
মূল লক্ষ্য গ্রামের দরিদ্র মানুষ, যাদের ধর্মান্তরিত করা বা মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। শহরের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী সমাজ; যারা শিল্প, প্রশাসন এবং সরকারি উচ্চপদে আসীন।
প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি মৌলিক চাহিদা পূরণ (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, পানীয় জল ইত্যাদি)। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, হার্ভার্ডে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ এবং বিশ্বমানের নেটওয়ার্কিং-এর প্রতিশ্রুতি।
সংযোগ মাধ্যম এই গোষ্ঠীর মানুষরা বৈশ্বিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং পাশ্চাত্যের সাথে সরাসরি যোগসূত্র ছিল না। হার্ভার্ড থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভারতীয় মধ্যস্থতাকারীরা এখন জ্ঞান আদান-প্রদানের মাধ্যমে সব স্তরে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
অনুদানের নেপথ্য উদ্দেশ্য (Motives for Funding)
ইতিহাসজুড়ে দেখা গেছে যে অনেক ধনকুবের মানবকল্যাণে অকাতরে দান করেছেন, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে মাঝে মাঝে এই সমাজসেবার আড়ালে কিছু অপ্রত্যাশিত এবং নেতিবাচক ফলাফল বেরিয়ে আসে। এই বইটি মূলত সেইসব দাতব্য প্রকল্পের পেছনের উদ্দেশ্যগুলো বিচার-বুদ্ধি দিয়ে খতিয়ে দেখার একটি প্রচেষ্টা। লেখকদের মতে, এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা নয়, বরং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে সূক্ষ্ম বিপদগুলো সাধারণত নজর এড়িয়ে যায়, সেগুলোর ওপর আলোকপাত করা।
কেন প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তিরা হার্ভার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানে এই ধরণের কার্যকলাপে অর্থায়ন করছেন, তার পেছনে লেখক চারটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেছেন:
১. মতাদর্শগত মিল: অনেক নতুন কোটিপতি বা তাদের সন্তানরা সিআরটি (CRT) বা অতি-বামপন্থী আদর্শে গভীরভাবে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছেন এবং জেনেশুনেই এসব প্রকল্পে অর্থ দিচ্ছেন।
২. প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞতা: কেউ কেউ হয়তো নিচু তলার মানুষের সাহায্য করতে চান, কিন্তু এর পেছনে যে গভীর কোনো রাজনৈতিক বা দেশবিরোধী ছক আছে, সেই ‘বিগ পিকচার’ সম্পর্কে তারা পুরোপুরি অজ্ঞ।
৩. সামাজিক মর্যাদা বা স্বার্থপরতা: হার্ভার্ডের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের উচ্চাসনে বসা, আভিজাত্য বজায় রাখা বা নিজেদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনেকে এসব দান করেন।
৪. বামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ: অনেক ক্ষেত্রে দাতারা পরোক্ষভাবে অতি-বামপন্থীদের দ্বারা প্রভাবিত হন, যাতে তাদের ব্যবসা বা পুঁজিবাদের ওপর বামপন্থী অ্যাক্টিভিস্টরা কোনো আঘাত না হানে।
অনুদানের নেপথ্যে আসল কারণ?
সহজ কথায় বলতে গেলে, এমন একটি ধারণা করা হচ্ছে যে কিছু দাতা হয়তো তাদের নিজেদের দুর্বলতা থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরাতেই এই পথ বেছে নিয়েছেন। অতি-বামপন্থীরা নামী দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমাজবিজ্ঞান বিভাগগুলোকে কবজা করে নিয়েছে। তারা দলিত, মুসলিম বা হার্ভার্ডের সংজ্ঞায় যারা ‘সুরক্ষিত গোষ্ঠী’, তাদের জন্য গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি তুলছে। তাদের লক্ষ্য হলো বড় বড় কোম্পানির বোর্ডে দলিত বা LGBTQ+ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সামাজিক ন্যাবিচারের দোহাই দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা। এমনকি তারা আমেরিকার সিসকো সিস্টেমস-এর মতো বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলাও শুরু করেছে। তাই হার্ভার্ডের মতো জায়গায় শক্তিশালী বামপন্থীদের অর্থায়ন করা অনেকটা ‘সুরক্ষা ফি’ বা মুখ বন্ধ রাখার টাকার মতো হতে পারে। ভারতীয় ধনকুবেররা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুব হিসাব কষে চলেন,ভারত বিষয়ক গবেষণায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও যেন তারা একই সতর্কতা অবলম্বন করেন।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট নিচে দেওয়া হলো:
১. নব্য মার্ক্সবাদ (The New Marxism):
কালো আমেরিকান এবং ভারতীয় দলিতদের এক করার চেষ্টা চলছে এবং শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আদলেই এখন ব্রাহ্মণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
বর্ণপ্রথাকে বা ‘কাস্ট’কে এখন বিশ্বজুড়ে কালো আমেরিকান ও অন্যান্য নির্যাতিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হওয়া সমস্ত বর্ণবাদের জননী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
উচ্চবর্ণের ভারতীয়দের তুলনা করা হচ্ছে ভারতের ‘শ্বেতাঙ্গ’ হিসেবে।
২. বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য:
এই নতুন আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া।
তবে এই ধ্বংসাত্মক পরিবর্তনের পর একটি নতুন ও টেকসই বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো কোনো স্পষ্ট পথ বা অভিজ্ঞতা তাদের নেই।
৩. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও নতুন সমাজ:
’ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি’ ব্যবহার করে বর্তমান সমাজ ভেঙে ফেলার পর, নতুন সমাজ ব্যবস্থা তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হবে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মতো প্রযুক্তির মালিক।
এ বিষয়ে ‘Artificial Intelligence and the Future of Power’- বই এ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভূমিকা (Harvard University’s Central Role)
এই নতুন ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ ভূমিকা পালন করছে:
১. তাত্ত্বিক কেন্দ্র ও প্রশিক্ষণ:হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এই বিশেষ মতাদর্শ তৈরি এবং সেটিকে সক্রিয় আন্দোলনে রূপ দেওয়ার মূল কেন্দ্র। এই ‘নতুন যুদ্ধে’ লড়াই করার জন্য তারা হাজার হাজার মানুষকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং নিজস্ব একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
২. ভারতীয় ধনকুবেরদের অবদান: জেনে হোক বা না জেনে, ভারতের অনেক প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি হার্ভার্ডের এই ‘ব্রেকিং ইন্ডিয়া’ কার্যকলাপে অর্থ যোগান দিচ্ছেন এবং একে এক ধরণের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছেন।
৩. ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ESG রেটিং: এই অনুদানের একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা হলো ‘ESG’ (Environmental, Social and Governance) রেটিং। এই রেটিং ভালো থাকলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক চুক্তি পাওয়া সহজ হয়। হার্ভার্ডে অর্থ দিয়ে তারা যেমন মর্যাদাপূর্ণ বোর্ডে আসন পাচ্ছেন, তেমনি সমাজসেবার আড়ালে এটি তাদের জন্য একটি লাভজনক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে।
৪. বিশ্বগুরু বনাম বিশ্বশিষ্য: ভারতীয়রা নিজেদের ‘বিশ্বগুরু’ বলে গর্ব করলেও,বর্তমানে হার্ভার্ডই প্রকৃত ‘বিশ্বগুরু’র ভূমিকা নিচ্ছে। এই ব্যবস্থায় ভারত কেবল তাদের ছাত্র (বিশ্বশিষ্য) হিসেবে কাজ করছে, যেখানে অনেক ভারতীয় মূলত তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমিক (বিশ্ব কুলি) বা সৈনিক (বিশ্ব সিপাহি) হিসেবে কাজ করে চলেছেন।
অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া (Response From Other Countries)
১. আমেরিকার পরিস্থিতি: অনেক আমেরিকান নাগরিক বর্তমানে ‘ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি’ বা ‘ওকিজম’ (Wokeism)-এর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তবে তারা হয়তো জানেন না যে এই একই সমস্যা ভারতে আরও ভয়াবহভাবে শিকড় ছড়াচ্ছে।
২. বৈশ্বিক প্রতিরোধ: চীন, ফ্রান্স, জাপান, ইসরায়েল এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যেই এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রচারভিযান শুরু করেছে।
৩. চীনের দ্বিমুখী চাল: চীন নিজের দেশে এই আদর্শকে কঠোরভাবে দমন করলেও, তাদের শত্রু দেশগুলোতে (যেমন: ভারত ও আমেরিকা) যারা এই মতাদর্শ প্রচার করছে, তাদের পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে।
বৈদিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব (Impact on the Vedic System)
১. তাত্ত্বিক আঘাত: বর্তমানে ‘ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি’ ব্যবহার করা হচ্ছে প্রাচীন বৈদিক সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার জন্য। সমাজের সব ধরণের সমস্যার জন্য বৈদিক কাঠামোকে দায়ী করে এক ধরণের নেতিবাচক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।
বৈদিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব (Impact on the Vedic System)
১. ভারতীয় সভ্যতার মূলে আঘাত: বর্তমানে একটি প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে ভারতের বর্ণপ্রথা, লিঙ্গবৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা সামাজিক অবিচারের মতো সমস্ত সমস্যার মূলে রয়েছে বৈদিক কাঠামো। এই যুক্তিতে দাবি করা হচ্ছে যে ভারতের বর্তমান সামাজিক সংকটের সমাধান করতে হলে বৈদিক কাঠামোর অস্তিত্ব মুছে ফেলতে হবে এবং ভারতীয় সভ্যতার ভিত্তিকেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে হবে।
২. আমাদের পাল্টা যুক্তি ও হার্ভার্ডের ভূমিকা: আমরা মনে করি, বৈদিক ব্যবস্থা সমস্যার কারণ নয়, বরং এটি মানবজাতির বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সমাধানের চাবিকাঠি। অদ্ভুত বিষয় হলো, একদিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বৈদিক ব্যবস্থার অমূল্য সম্পদগুলো (যেমন—ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যোগব্যায়াম, ধ্যান, নিরামিষভোজ, অধিবিদ্যা বা প্রকৃতির সাথে ভারসাম্য) আত্মসাৎ বা ‘ডাইজেশন’ (digestion) করতে ব্যস্ত। তারা এগুলোকে নিজেদের এবং পাশ্চাত্যের মেধাসম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। আমরা ভারতীয় ধনকুবেরদের এই চুরির বিষয়ে সতর্ক করার চেষ্টা করলেও তারা গুরুত্ব দেন না। গত পঁচিশ বছর ধরে হার্ভার্ডের করা এ ধরণের অসংখ্য বৌদ্ধিক চুরির উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।
ভারতের আত্মবিনাশ (India’s Self-destruction)
১. এলিট ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা: ভারতের শাসক শ্রেণী এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা এই গভীর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অনেকাংশেই অজ্ঞ। ফলে তাদের শক্তি ও প্রচেষ্টা ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে, যা উল্টো ভারতের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২. সরকারের অবস্থান: জেনে হোক বা না জেনে, ভারত সরকারও মার্ক্সবাদী বিপ্লবের এই নতুন সংস্করণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।
৩. গ্লোবাল লেফ্ট ও ভারতীয় কর্মীবাহিনী: সমাজের উঁচু স্তর থেকে নিচু স্তর পর্যন্ত অসংখ্য ভারতীয় বর্তমানে এই ‘গ্লোবাল লেফ্ট’ বা বিশ্বব্যাপী বামপন্থী শক্তির অধীনে কাজ করছে। তারা মার্ক্সবাদী বিপ্লবের এই নতুন অবতারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, যারা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘ওক’ (Woke) শব্দটি মূলত ‘ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি’ (Critical Race Theory)-র একটি জনপ্রিয় প্রতিশব্দ। এটি ব্ল্যাক আমেরিকানদের মধ্যে শুরু হয়েছিল সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য। যদিও এই সচেতনতা তৈরির ইতিবাচক দিক ছিল, কিন্তু এর পরবর্তী সাফল্যের জন্য উদার মানসিকতা এবং মুক্ত আলোচনার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন।
কিছু উস্কানিমূলক প্রশ্ন (Some Provocations)
একজন মুক্তচিন্তক হিসেবে কোনো ভয় বা প্রতিহিংসার তোয়াক্কা না করে কিছু মৌলিক বিষয়ে আলোকপাত করা দরকার:
শ্রেণিবিন্যাস বা হায়ারার্কি কি স্বাভাবিক? মানুষের সমাজে কি শ্রেণিবিন্যাস থাকা কি অনিবার্য? পশুপাখিদের মতো মানুষের মধ্যেও কি সহজাত শক্তির পার্থক্য বিদ্যমান নয়? কোনো সামাজিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি এই ব্যক্তিগত পার্থক্য বা বৈচিত্র্য পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে? সমান ফলাফলের পেছনে না ছুটে কি সমান বিচার নিশ্চিত করার কোনো উপায় আছে?
দক্ষতা ও মর্যাদা: যদি একজন ব্যক্তি সার্জন হওয়ার যোগ্য হন আর অন্যজন মালি হওয়ার, তবে এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কি তাদের সমান মর্যাদা দেওয়া সম্ভব? তাদের নিজ নিজ পেশার পরিধিতে সুখের পরিমাপ কি একই হতে পারে? মানুষের চেতনার স্তরকে উন্নত করতে কি বেদ ও বৌদ্ধ দর্শনের ভারতীয় পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করা আরও কার্যকর হবে না?
পুরানো কাঠামো বনাম পাশ্চাত্য প্রভাব: বর্তমানের ভোগবাদ কি মানুষের অতৃপ্তি ও অসম বৈষয়িক ফলাফলের মূল কারণ? উত্তরাধিকার আইন কি আসলে সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য দায়ী?
হেগেল ও মার্ক্সবাদী দ্বন্দ্বের চ্যালেঞ্জ: হেগেল এবং মার্ক্স থেকে শুরু করে বর্তমানের ‘ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি’ পর্যন্ত যে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি চলছে, তা মূলত বর্তমান ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার ডাক দেয়। কিন্তু এর বিকল্প সমাধান অন্য কোনো সভ্যতা দিতে পারে কিনা, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? উদাহরণস্বরূপ, বেদান্ত দর্শনে ‘বিপরীত জোড়া’ (pair of opposites) যেমন—পক্ষ ও বিপক্ষ (thesis and anti-thesis)—উভয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ার বা আত্মস্থ করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে মার্ক্সবাদী দ্বন্দ্ব দুটি সত্তার মধ্যে লড়াই লাগিয়ে দেয়, সেখানে বেদান্ত ও বৌদ্ধ দর্শন মানুষকে অহংকারের স্তর (ego level) থেকে উচ্চতর চেতনায় নিয়ে যায়।
বিদ্রূপের বিষয় (The Irony):
সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো এই যে, বর্তমানে পাশ্চাত্যের বামপন্থীদের একটি বড় অংশ ভারত থেকে আমদানিকৃত আধ্যাত্মিক চর্চা বা ধ্যান পদ্ধতিগুলো নিয়মিত অনুশীলন করছে। অথচ সেই একই গোষ্ঠী বা আদর্শের অনুসারীরা ভারতের মূল আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ভিত্তিগুলোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে সচেষ্ট।
চেতনার আন্দোলন ও বৈদান্তিক প্রভাব
বর্তমানে পদ্ধতিগত উপায়ে চেতনা বৃদ্ধির (raising consciousness) ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে পাশ্চাত্যে ভারতীয় ধ্যান পদ্ধতির প্রসারের ফলে ‘কনসাসনেস মুভমেন্ট’ বা চেতনার আন্দোলন নামে একটি বড় ধারা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এমন অনেক বই, ভিডিও ও সেমিনার জনপ্রিয় হচ্ছে যা মূলত বেদান্ত বা বৌদ্ধ দর্শনের একটি বিশেষ দিক প্রচার করে: অহংকারের স্তরে (ego level) লড়াই না করে কেবল চেতনার মানোন্নয়নের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ওকিজম’ (Wokeism)-এর ধারণাগুলোকে ভারতের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে এবং এর ফলে ভারতের প্রাচীন সভ্যতার কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সচেতনতা বৃদ্ধি: অনেক ভারতীয় না জেনেই হয়তো এসব প্রকল্পকে সমর্থন করছেন। এই প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি বা ‘এন্ড গেম’ সম্পর্কে তাদের গভীরভাবে অবহিত করাই উদ্দেশ্য।
সমাপনী আহ্বান
“অজ্ঞানতা হলো পৃথিবীর সমস্ত সমস্যার মূল, আর বৈদিক জ্ঞানই হলো তার সমাধান।”