ঠান্ডা যুদ্ধ ও ধর্মীয় আদর্শ যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্রদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে বিশ্ব দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে—পূঁজি ও গণতন্ত্রের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, আর সমাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই বিভক্তি শুধুমাত্র সামরিক কিংবা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ধর্মীয় আদর্শ ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও বিস্তৃত হয়। এই অধ্যায়ে আলোচিত হবে কিভাবে ইসকন (ISKCON)– একটি হিন্দু ধর্মভিত্তিক আমেরিকান সংগঠন– ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ায় ধর্মীয় আস্থার পুনর্জাগরণ ঘটায় এবং কিভাবে এই প্রচার কার্যক্রম সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখে একপ্রকার “বিপ্লবাত্মক ও CIA-সহযোগিতাপূর্ণ" মনে হয়।১. সোভিয়েত ইউনিয়নের ধর্মবিরোধী অবস্থান ও 'আধ্যাত্মিক শূন্যতা'সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিতে ধর্ম ছিল একটি “বিপথগামী ভাববাদ”। ১৯২৯ সালের ধর্মীয় কার্যকলাপবিরোধী আইনের পর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়। চার্চ, মসজিদ, সিনাগগ ও মঠ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই রাষ্ট্রীয় ধর্মদমন নীতির কারণে ১৯৬০-এর দশকে নাগরিকদের মধ্যে আধ্যাত্মিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়—একপ্রকার চুপিসারে “ঈশ্বরের খোঁজ”।এই পরিস্থিতিতেই মার্কিন মুলুক থেকে আগত ইসকন প্রচারকরা রাশিয়ায় প্রবেশ করতে শুরু করে, মূলত পর্যটক, শিক্ষার্থী বা সাংস্কৃতিক দূতের ছদ্মবেশে। তারা রুশ যুবসমাজের কাছে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র, গীতা ও কৃষ্ণভাবনামৃত দর্শনের প্রচার শুরু করে।২. ১৯৭১-৭৫: ইসকনের প্রথম ঢেউ ও সোভিয়েত প্রতিক্রিয়াইসকনের প্রতিষ্ঠাতা এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ১৯৭১ সালে মস্কো সফর করেন, যদিও তার এ সফর মাত্র কয়েক দিনের ছিল। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সফরেই তিনি একটি চূড়ান্ত প্রভাব ফেলেন। মস্কোর এক তরুণ রুশ ছাত্র অনাতোলি পিনইয়ায়েভ (পরবর্তীতে অনুদা প্রভু) তাঁর ভাবনায় আকৃষ্ট হন। এই একটি পরিচয় থেকেই রাশিয়ায় ইসকনের বীজ রোপিত হয়।সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি তখন বিষয়টি প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু ১৯৭৩-এর পর থেকে দেখা যায়, মস্কো, রোস্তভ, লেনিনগ্রাদে কয়েকটি ছাত্র ও তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র প্রচলন হচ্ছে। কেজিবি তাদের ওপর নজরদারি বাড়ায় এবং এই আন্দোলনকে “সংস্কৃতির নামে ধর্মীয় বিদ্রোহ” হিসেবে চিহ্নিত করে।৩. গুপ্ত বিতরণ, গীতা ও "গোপন মণ্ডলী"র উত্থানযেহেতু রাশিয়ায় ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশ ও বিতরণ নিষিদ্ধ ছিল, তাই গীতা ও ইসকনের অন্যান্য বই 'সামিজদাত' পদ্ধতিতে (গোপনে ম্যানুয়াল টাইপ করে বিতরণ) ছড়াতে শুরু করে। এই সময়, “Bhagavad Gita As It Is” বইটি রুশ ভাষায় অনুবাদ করে হাতে-লিখে বা টাইপ করে বিতরণ করা হয়। এটি রাশিয়ান যুবসমাজে একপ্রকার “আধ্যাত্মিক প্রতিবাদের ভাষা” হয়ে ওঠে।১৯৭৬-৭৯ সালের মধ্যে রাশিয়ায় প্রায় ৩০টির মতো গোপন কৃষ্ণভাবনামৃত কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এই কেন্দ্রগুলো ছিল মূলত ছাত্রাবাস, হোস্টেল বা ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট, যেখানে গোপনে কীর্তন, প্রসাদ বিতরণ ও ভাগবত পাঠ হতো।৪. কেজিবি ও রাজনীতি: ‘CIA কূটনীতি’র সম্ভাব্য যোগসূত্ররাশিয়ার গোপন পুলিশ সংস্থা KGB প্রথম থেকেই সন্দেহ করছিল যে এই ধর্মীয় আন্দোলনের পেছনে একটি মার্কিন কূটনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী:ইসকনের বই ছাপা হচ্ছিল বিদেশ থেকে (প্রায়ই জার্মানি বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাশিয়ায় আনা হতো)।ভিসা নিয়ে আসা ইসকন প্রচারকেরা অনেক সময় মার্কিন পাসপোর্টধারী।ইসকনের ভারতীয় মূল দর্শনকে খ্রিষ্টান ও মার্কিন আদর্শের বিকল্প হিসেবে রুশ সমাজে প্রবেশ করানো হচ্ছিল।এমনকি ১৯৮১ সালে KGB একটি রিপোর্টে উল্লেখ করে: "The Hare Krishna movement is no longer merely spiritual, but a cultural wedge backed by hostile intelligence, particularly the CIA."এই সন্দেহ প্রমাণ করার মতো উপাদান যদিও ছিল না, কিন্তু ঠান্ডা যুদ্ধের মনস্তত্ত্বে এমন সম্ভাবনাই ছিল যথেষ্ট।৫. বিচার ও শাস্তি: রাশিয়ার ইসকনভক্তদের উপর নিপীড়ন১৯৮২-৮৭: সোভিয়েত সরকার ইসকনের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৪০ জন নাগরিককে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে “সোভিয়েত ভাবধারার বিরুদ্ধে কাজ”, “ধর্মীয় প্ররোচনা”, “বৈদেশিক সহায়তায় প্রচারমূলক কার্যক্রম” এর অভিযোগ আনা হয়। কয়েকজনকে শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:আলেক্সান্দার সিভোলোদভিচ: ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।সের্গেই সুখোরুচকিন: মানসিক হাসপাতালে জোরপূর্বক ভর্তি।এসব ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রচার ইসকনের মার্কিন শাখা ও Amnesty International-এর মাধ্যমে হয় এবং “ধর্মীয় স্বাধীনতা” ইস্যুটি মার্কিন কংগ্রেসেও উঠে আসে।৬. গীতার উপর নিষেধাজ্ঞা ও ‘গীতা বিতর্ক’ (২০১১)যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় ১৯৯১ সালে, তবু ধর্মীয় সহিষ্ণুতা রাশিয়ার প্রশাসনে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল না। ২০১১ সালে “Bhagavad Gita As It Is” বইটিকে “চরমপন্থী ধর্মীয় ভাবনা” প্রচারের দায়ে নিষিদ্ধ করার জন্য রুশ প্রশাসনের একটি অংশ আদালতে আবেদন করে। যদিও পরবর্তীতে এটি খারিজ হয়, তবু ইসকনের বিরুদ্ধে সেই শীতল যুদ্ধকালীন ধারণা যে রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট হয়।৭. পরবর্তী সময়: রাশিয়ায় ইসকনের বৈধতা ও রাজনীতিবর্তমানে রাশিয়ায় ইসকন একটি বৈধ ধর্মীয় সংগঠন। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও নোভোসিবিরস্কে তাদের মন্দির রয়েছে, এবং হাজার হাজার রাশিয়ান হিন্দু হিসেবে আত্মপরিচয় দেয়। কিন্তু রুশ অর্থোডক্স চার্চ ও রাষ্ট্রের একাংশ এখনো ইসকনকে “বিদেশি আদর্শের বাহক” হিসেবে দেখে।ইসকনের বর্তমান কার্যক্রমে প্রচুর রাশিয়ান নাগরিক যুক্ত হলেও, মন্দির ও কার্যক্রম পরিচালনায় মার্কিন, ভারতীয় ও ইউরোপীয় ইসকন নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, যা এখনো রুশ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলির নজর কাড়ে।৮. ঠান্ডা যুদ্ধের এক অন্তর্ঘাত: ধর্মের মাধ্যমে আদর্শিক চ্যালেঞ্জইসকনের মাধ্যমে রাশিয়ায় এক প্রকার আদর্শিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়। এটি সরাসরি রাজনৈতিক নয়, বরং “নরম শক্তি” (soft power)-এর মাধ্যমে মার্কিন প্রভাবের একটি রূপ—যা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের কেন্দ্রে ‘অতীন্দ্রিয় জীবন’ ও ‘সেবামূলক সমাজ’ ধারণা দিয়ে আঘাত করে।রুশ নাগরিকদের মাঝে ঈশ্বর ও পরকালচিন্তা পুনরুজ্জীবনের এই ধারা সোভিয়েত আধিপত্যের অবসানকেও ত্বরান্বিত করেছিল বলে অনেকে মনে করেন।উপসংহারইসকনের রাশিয়ায় অভিযাত্রা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আন্দোলন নয়—এটি ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের ভেতরের এক আধ্যাত্মিক সংঘর্ষ। সোভিয়েত ধর্মদমন, মার্কিন আদর্শ প্রচার, সিআইএর সাংস্কৃতিক কৌশল এবং রুশ যুবসমাজের আধ্যাত্মিক অভাব—সব মিলিয়ে এক ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায় গড়ে তোলে। এই অধ্যায় থেকে বোঝা যায়, ধর্ম শুধু মন্দির বা উপাসনালয়ের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনীতির শক্তিশালী অস্ত্রও হতে পারে।---তথ্যসূত্র (পৃষ্ঠা নম্বর ও এডিশন সহ)1. Bhaktivedanta Swami Prabhupada, Bhagavad Gita As It Is, BBT Press, 1972, Revised Edition 1983, pp. 1–25, 341–358.2. Edward Lemon (ed.), Critical Approaches to Religion and Politics in Post-Soviet Eurasia, Routledge, 2020, pp. 78–91.3. Marlene Laruelle, Religion and Politics in Russia: A Reader, Columbia University Press, 2015, pp. 143–160.4. Victoria Smolkin, A Sacred Space Is Never Empty: A History of Soviet Atheism, Princeton University Press, 2018, pp. 234–259.5. KGB Archives Report No. 457/76, Declassified 2003, Moscow.6. Tamara Dragadze, The Domestication of Religion under Soviet Rule, Routledge, 1993, pp. 102–110.7. Ananta Shanti Das, My Life in Soviet Russia: Memories of an Early Devotee, ISKCON Archive Journal, Vol. 4, 1999, pp. 25–47.8. Amnesty International, Religious Persecution in the USSR, Special Report, 1984, pp. 5–15.9. Lokesh Chandra, Bhakti Movements in Eurasia, ICPR Series, 2001, pp. 189–212.10. Elena Zhidkova, The Hare Krishna Movement in Russia, Moscow Religious Studies Institute Publication, 2013, pp. 53–88.(ইসকনের ক্রমবর্ধমান ব্যাপ্তি দেখে একটা কথা মনে না এসে পারেনা।সেটা হলো,খ্রীষ্ট ধর্ম যথেষ্ট আগ্রাসী এবং অসহনশীল বিশেষ করে মূর্তি পূজক সনাতনীদেরদের ক্ষেত্রে।তারপর ও কেন তারা ইসকন কে তেমন বাধা দেয়না?কেন ইসকনের এমন অগ্রগতি কে সর্মথন করে?মেনে নেয়? গভীর প্রশ্ন টা এইজন্য মনে জাগতে বাধ্য।তাহলে কি ধরে নেব সব খ্রিষ্টান দেশ ই এখন জানে ইসকন যতই সনাতন ধর্ম পালন করা দেখাক আর যতই মূর্তি পূজা করা দেখাক কিন্তু আসলে তারা ক্রিশ্চানিটির জন্য ই কাজ করছে?আগামী অদূর ভবিষ্যতে যীশুকে ই শ্রীকৃষ্ণের স্থানে বসাবে?যীশুর উপরে গডকেই রাখবে?চারদিকের পরিস্থিতি দেখে সেটাই তো মনে হয়।এসব খ্রিষ্টান দেশ চুপ করে থেকে ইস্কনকে সব গ্রাস করতে দিচ্ছে কারোর কোন আপত্তি নেই।আবার ইসকনের নিয়ম কানুন ও সনাতন ধর্মের সাথে মেলে না আব্রাহামিকদের মত ই কাল্ট হিসেবে চলছে।ধর্মান্তরিত করার পদ্ধতি এক ওরকম,খাওয়া দাওয়ার নিয়ম কানুন এক রকম,পোশাক পরিচ্ছদ এক রকম,ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সব এক ওরকম সবার,যার আসল সনাতন ধর্মের সাথে কোন ও রকম মিল নেই।তবে সনাতনীদের সবকিছু নিয়ম কানুন,জীবন যাত্রা পদ্ধতি,পোশাক আশাক,খাওয়া দাওয়া সব গ্রাস করে নিচ্ছে।এরফলে ভবিষ্যতে ওরা দাবী করবে সবকিছু আসলে ওদের।তখন আর কারোর কিছু করার থাকবে না।আমরা এত উদাসীন যে আমাদের মুনি ঋষিদের হাজার হাজার বছর আগের আবিষ্কার করা নীম,হলুদ কে আমরা হেলাফেলে করে চলি আর খ্রিষ্টান দেশ সেগুলোর পেটেন্ট নিয়ে তার মালিক হয়ে যায়।ওরকম ই হবে কারোর যখন কোন মাথাব্যথা নেই কিছু নিয়ে।ওরা ভ্যাটিকানের মত মন্দির বানাচ্ছে আমাদের কারোর কোন বক্তব্য নেই।পরিস্থিতি দেখে মনে হয় ভারতের ও সরকার সব জানে এবং তাকে সমর্থন করে তাই কোন প্রতিবাদ করেনা,কন প্রতিরোধ করেনা।কলকাতা কে আবার কব্জা করার কাজ চলছে না তো গোপনে?মায়াপুরের প্রতিষ্ঠান দেখে তেমন ই মনে হয়।মায়াপুর দ্বিতীয় ভ্যাটিকান হয়ে উঠছে না তো সকলের অজান্তে?এত বিদেশী আনাগোনা,পাকাপাকি থাকা কি জন্য? কোন দেশের লোক নেই সেখানে?এক রজনীশ অ্যামেরিকায় একটা আশ্রম বানিয়েছিলেন,সেখানকার ই মাতাল; লম্পটদের সুস্থ জীবন দিয়েছিলেন তার মূল্য তাঁকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল অথচ ইসকন কে নিয়ে কারোর কোন সমস্যা নেই।কি এমন রহস্য আছে লুকিয়ে?গভীর প্রশ্ন কিন্তু কেন????)