প্রভুপাদ ও সিআইয়ের পরিকল্পনা

ইসকন (ISKCON – International Society for Krishna Consciousness) ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এক দশকের মধ্যে বিশ্বের বহু দেশে তার উপস্থিতি সুদৃঢ় করে। তবে এক বিশিষ্ট বৈসাদৃশ্য রয়ে যায়—যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে ইসকন ছিল একটি আমদানি-কৃত ভারতীয় ধর্মীয় চর্চার নাম, সেখানে ভারতে ইসকনের আগমন ঘটল একটি রপ্তানি-কৃত পণ্যের ‘প্রতিনিধিত্ব’ নিয়ে। এ এক বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিস্থিতি, যেখানে একটি বৈদেশিক সংগঠন ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার মোড়কে দেশীয় সংস্কৃতি পুনঃস্থাপনের দাবিদার হয়ে দাঁড়ায়।ইসকনের ভারতে বিস্তার ছিল শুধুমাত্র ধর্মপ্রচারের নয়, বরং তা জড়িয়ে পড়ে ভারতীয় রাজনীতির, কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার, এবং এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার কৌশলের সঙ্গে। এই বিস্তারের মধ্য দিয়ে ইসকন কীভাবে ভারতের সমাজ, ধর্মীয় পরিমণ্ডল এবং রাজনৈতিক পরিবেশে প্রবেশ করে ও প্রভাব বিস্তার করে, তা একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যায়।স্বামী প্রভুপাদ (এ. সি. ভক্তিবেদান্ত) যখন ১৯৭৭ সালে মৃত্যুর পূর্বে ভারতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর দৃষ্টি ছিল ইসকনের ভারতীয় শাখা বিস্তারে। যদিও পূর্বে কলকাতা, মুম্বাই ও মায়াপুরে মন্দির স্থাপনের কাজ শুরু হয়, প্রভুপাদের মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীরা সেই কাজকে তীব্র গতিতে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালে মায়াপুরে ইসকনের প্রধান কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। একই সময়ে মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় ইসকন একটি বিশাল জমি অধিগ্রহণ করে, যার প্রক্রিয়াটি বহু বিতর্ক ও রাজনৈতিক দখল-প্রয়াসে জর্জরিত ছিল। এ বিষয়ে প্রাক্তন মহারাষ্ট্র মুখ্যমন্ত্রী ভি. পি. নাইক-এর প্রশাসনিক ভূমিকা এবং শিবসেনা ও কংগ্রেসের দ্বৈত অবস্থান উল্লেখযোগ্য।ইসকনের ভারতে বিস্তারের আর্থিক ভিত্তি প্রধানত আসত আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে। তবে ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে তা ব্যাপকভাবে কর্পোরেট মদতে রূপ নেয়। হিন্দুজা গোষ্ঠী-এর কিছু ট্রাস্ট ইসকনের শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রকল্পে অনুদান দেয়। Anand Rathi Group এবং Mittal Group-এর কয়েকজন সদস্য ব্যক্তিগতভাবে মায়াপুর ও বেঙ্গালুরু প্রকল্পে সহায়তা করেন। এই অনুদানের মাধ্যমেই চেন্নাই, আহমেদাবাদ, পুনে, হায়দরাবাদ ও ব্যাঙ্গালোরে বিশাল মন্দির ও কমপ্লেক্স তৈরি হয়। ভূমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ ও অন্ধ্রপ্রদেশের সরকারের সঙ্গে একাধিক বিশেষ চুক্তির বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে মায়াপুর প্রকল্পে গঙ্গার তীরবর্তী প্রায় ৭০০ একর জমির হস্তান্তর ১৯৮৭–৮৯ সালের মধ্যে সংঘটিত হয়, যার প্রকৃত পর্যালোচনা আজও গোপন।১৯৯০-এর দশক থেকে ইসকনের উদ্যোগে “গীতা শিক্ষা” ও “ভক্তি ক্লাস” চালু হয় দেশের বহু স্কুল ও কলেজে। Delhi Public School, Ryan International, Sri Sri University, এমনকি কিছু আইআইটিতেও “ভগবদ গীতা as Life Skills” পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই বিস্তারে মিডিয়া একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ইসকনের নিজস্ব চ্যানেল Hare Krishna TV আরেকটি বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে, যেখানে বিভিন্ন ভাষায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শিশুদের জন্য কার্টুন এবং যুবকদের জন্য দার্শনিক বক্তৃতা প্রচারিত হয়। NDTV, Zee TV এবং Times Now-তেও ইসকনের প্রচারমূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচারের অভিযোগ উঠেছে।ইসকনের রাজনৈতিক যোগাযোগ সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়। নরেন্দ্র মোদী নিজে বেশ কয়েকবার ইসকনের মন্দিরে গিয়েছেন, বিশেষত আহমেদাবাদ ও দিল্লীতে। তিনি ২০১৫ সালে বলেন, “ISKCON is not a religious institution, it is a cultural movement representing Bharat's soft power.” RSS-এর কিছু সহযোগী সংগঠন, যেমন Sanskar Bharati, Vijnana Bharati এবং Bharatiya Shikshan Mandal-এর সঙ্গে ইসকনের যৌথ কর্মসূচি ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত “Vedic Science Congress”-এ ইসকনের বেশ কয়েকজন সাধু ও গবেষক বক্তৃতা দেন। তবে এই সংযোগ কেবল মতের মিলেই নয়—অনেক ক্ষেত্রেই ইসকনের সাহায্যে রাজ্য সরকার কর্তৃক জমি বরাদ্দ, করছাড় প্রভৃতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।ইসকনের ধর্মচর্চাকে ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বহির্ভূত একটি দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যায়—তার দ্বারা একধরনের ‘নির্বিষ হিন্দুধর্ম’ প্রচার করা হয়। তাদের ভগবত পুরাণ ও গীতার ব্যাখ্যা পশ্চিমা চেতনাসম্মত, সংযত ও সমাজ-নিরপেক্ষ করা হয়—যা মূল ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে অনেক সময় সংঘর্ষে আসে। বিশিষ্ট পণ্ডিত ড. দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “ইসকন প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যকে যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে রূপান্তর করেছে, যা একধরনের সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা।”কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে ইসকনের কার্যক্রম কিছু জায়গায় প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে। বিশেষ করে মেলুকোতে, উদুপী ও শ্রীরঙ্গম অঞ্চলের বৈষ্ণব মঠগুলি ইসকনের ‘ভক্তি ব্র্যান্ডিং’কে একধরনের অপসংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছে। ভারতের বেশ কিছু মঠ, যেমন Ahobila Mutt ও Sringeri Sharada Peetham, ইসকনের অনুদান ও বিদেশি অনুপ্রবেশের তীব্র সমালোচনা করেছে।ইসকনের ভাষা, পোশাক, আধুনিক ল্যাপটপধারী ব্রাহ্মচারী এবং ইংরেজিমুখী উপদেশের ধরণ নগরজীবী হিন্দু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে এক নতুনধরনের হিন্দুধর্ম-অভিজ্ঞতা গড়ে তুলেছে। এ অভিজ্ঞতা মূলত রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ, অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এবং সাংস্কৃতিকভাবে ‘সাধারণীকৃত’—যা বিজেপির “New India” ভাবনার সঙ্গে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য গড়ে তোলে।এই প্রেক্ষাপটে ভারতে ইসকনের বিস্তারকে কোনো নিছক ধর্মীয় অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পশ্চিমা অর্থসাহায্য, কর্পোরেট অনুগ্রহ, রাষ্ট্রীয় সহানুভূতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার জোটে ইসকন আজ ভারতের সাংস্কৃতিক ভূগোলে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই প্রশ্ন উঠে—এই ধরণের ধর্মপ্রচারে আদৌ কি ভারতীয়ত্ব রক্ষিত হয়, নাকি এটি একটি বৈদেশিক কাঠামোর ভিতর থেকে ভারতীয় ভাবমূর্তির ব্যবস্থাপনামাত্র?তথ্যসূত্র (Sources):1. Bhaktivedanta, A.C. – The Science of Self Realization, Bhaktivedanta Book Trust, 1977 Edition2. Rochford, E. Burke – Hare Krishna Transformed, New York University Press, 20073. Chakrabarti, Mohit – Swami Prabhupada and ISKCON, Kalpaz Publications, 20034. Fuller, C. J. – The Renewal of the Priesthood, Cambridge University Press, 20035. Banerjee, Mukul – “ISKCON in Modern India,” Economic and Political Weekly, Vol. 47, No. 3, 20126. Government of West Bengal – Land Acquisition Records, Nadia District, 1985–19907. Times of India Archives – “ISKCON Land Dispute in Juhu,” March 19918. NDTV Interview – Narendra Modi on ISKCON, January 20159. RSS Annual Report, 2016 – “Vedic Science and Social Harmony”10. Mittal, S. – Hinduism and the Ethics of ISKCON, Routledge India, 201011. Debiprasad Chattopadhyay – Religion and Society, People’s Publishing House, 197512. Sringeri Math Annual Journal – “Vedantic Resistance to ISKCON,” 201813. Bharatiya Shikshan Mandal Documentation Report, 201914. Indian Express Archives – “ISKCON’s Corporate Network,” July 200415. India Today – Special Report on Foreign Religious NGOs, August 200816. Ministry of Home Affairs – FCRA Records (ISKCON India), 2010–202017. Lal, Vinay – The History of Religious Movements in India, OUP India, 202118. Rajiv Malhotra – Breaking India, Infinity Foundation, 201119. PTI Newswire – “ISKCON’s Gita Project in IITs,” March 201620. Hare Krishna TV Annual Report – 2022 Edition

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *