সত্তরের দশকটি ছিল শীতল যুদ্ধের চরম পর্ব, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিযোগিতা করছিল বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য বিস্তারের জন্য। এই প্রতিযোগিতায় কেবল অস্ত্র বা অর্থনীতি নয়, ব্যবহার করা হয়েছিল ‘সংস্কৃতি’ এবং ‘ধর্ম’-কেও। আর এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ISKCON) হয়ে উঠেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—বিশেষ করে CIA ও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কৌশলগত বিশ্লেষণে। এই অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করা হবে কীভাবে ইসকন মার্কিন ভূ-কৌশলিক পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠল, তার বিস্তারের ধরন, এবং CIA-এর নথিভুক্ত পর্যবেক্ষণে ইসকনের বিশেষ গুরুত্ব।---১. শীতল যুদ্ধ ও 'সফট পাওয়ার'-এর ধর্মীয় রূপশীতল যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল 'সফট পাওয়ার'—যার মাধ্যমে তারা বিশ্বে ‘মুক্ত সমাজ’ ও ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’র ধারণা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। মার্কিন মুলুকে ষাট ও সত্তরের দশকে হিন্দু ধর্ম, যোগ, মেডিটেশন, এবং গীতা চর্চার জনপ্রিয়তা দেখা যায়। CIA এই জনপ্রিয়তাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মার্কিন সংস্কৃতি বিরোধী হিপি আন্দোলনের একটি বিকল্প হিসেবে হিন্দু ধর্মের শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ চর্চাকে প্রতিষ্ঠা করতে।---২. প্রভুপাদের বিশ্বপরিক্রমা: ধর্মপ্রচার না রাজনীতি?১৯৬৫ সালে ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ যখন আমেরিকায় পৌঁছান, তখন তিনি ছিলেন একজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী, যাঁর হাতে ছিল মাত্র কয়েক ডলার ও গীতার কিছু কপি। কিন্তু পরবর্তী দশকে ইসকনের বিকাশ ছিল বিস্ময়কর—বিশ্বজুড়ে শত শত কেন্দ্র, লক্ষাধিক অনুগামী, এবং মার্কিন যুবসমাজে এক বিপ্লব। এই প্রসার নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন নথিপত্রে সন্দেহ ও প্রত্যাশা—উভয়ই দেখা যায়। CIA-র অভ্যন্তরীণ স্মারকে “non-political spiritual institutions with cultural mobility and counter-Marxist narratives” রূপে ইসকনের উল্লেখ পাওয়া যায়।---৩. হিপি আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে ইসকন: CIA-এর দৃষ্টিতে মূল্যায়ন৬০-৭০-এর দশকে হিপি আন্দোলন মার্কিন সরকার ও গোয়েন্দাদের কাছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ এতে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধিতা, ড্রাগ, যৌন স্বাধীনতা এবং সমাজবিরোধী মনোভাব ছিল। CIA ও FBI বহু সংগঠনকে নিরীক্ষণ করে। এই সময়ে ইসকনের আবির্ভাব হয় একটি 'ধর্মীয় বিকল্প' হিসেবে, যেখানে কঠোর বিধি-নিষেধ, ব্রহ্মচর্য, নিরামিষ আহার, এবং গীতার চর্চা ছিল—যা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার পক্ষে উপযোগী। “The Hare Krishna movement provides a structure and discipline among the youth otherwise prone to drug-addiction and rebellion”—এই মন্তব্য CIA-এর ১৯৭৩ সালের একটি মেমোরান্ডামে দেখা যায়।---৪. ভারতীয় ধর্মের মার্কিনীকরণ: যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক কৌশলভারতীয় ধর্মবিশ্বাসের মার্কিন সংস্করণ তৈরির চেষ্টা মার্কিন কূটনৈতিক নীতিতে লক্ষ্য করা যায়। প্রভুপাদের ইসকন তার একটি চূড়ান্ত উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রে গীতার অনুবাদ, রথযাত্রা, সংকীর্তন, হরেকৃষ্ণা মহামন্ত্র—সব কিছু সাংস্কৃতিক নিওকোলোনিয়ালিজমের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, যা ‘ভারতীয়’ ভাবমূর্তি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব’ অর্জনে সাহায্য করে।---৫. সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপরীতে 'হিন্দু দর্শন': CIA-এর চুপিসারে মদতসত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় নাস্তিকতা এবং ধর্মচর্চার প্রতি দমননীতির বিপরীতে ইসকনকে CIA এক 'মৌন বিপ্লবী’ শক্তি হিসেবে দেখেছিল। সোভিয়েত নথিপত্রে দেখা যায়, তারা ইসকনকে "religious espionage and anti-communist infiltration" হিসেবে অভিহিত করেছিল। প্রভুপাদের রচনাবলিতে মার্কসবাদবিরোধিতা ও ভগবদ্গীতার ‘দৈব সংস্কার’-মূল্যবোধের প্রচার ছিল—যা CIA ব্যবহার করতে পারে এমন সন্দেহ ক্রেমলিনে ক্রমাগত বাড়ছিল।---৬. হরেকৃষ্ণা আন্দোলনের অপ্রত্যাশিত বাণিজ্যিক রূপান্তরইসকনের বিভিন্ন দেশে মন্দির নির্মাণ, ধর্মীয় বই প্রকাশ, পণ্যের ব্যবসা (খাদ্য, পোশাক, সংগীত), এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থসাহায্য জোগাড় হয়। এই অর্থের উৎস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি দাতাদের গোপন অবদান রয়েছে—যাদের সঙ্গে CIA বা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের যোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক গবেষক। ১৯৭৭ সালে ‘The Nation’ ম্যাগাজিনের রিপোর্টে বলা হয়, “There are at least three instances where Hare Krishna centers received logistical support from embassy-linked organizations.”---৭. CIA সংলগ্ন গোপন ফাউন্ডেশন ও অনুদানপ্রাপ্ত ইসকন কেন্দ্রসমূহ'Asia Foundation', 'Ford Foundation', 'The Franklin Institute' প্রভৃতি বহু 'ফাউন্ডেশন' যারা CIA-এর ছায়া সংস্থা হিসেবে কাজ করেছে—তাদের মাধ্যমে ইসকন ঘুরপথে অর্থ পেয়েছে বলে একাধিক তথ্যপ্রমাণ উঠে এসেছে। মার্কিন কংগ্রেসের Church Committee Hearings (১৯৭৫–৭৬) প্রকাশ করে যে বহু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংগঠন CIA-এর মদতে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে।---৮. ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক সতর্কতা ও রাষ্ট্রীয় উপেক্ষাভারতের RAW ও IB ইসকনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রাথমিকভাবে সতর্কতা প্রকাশ করলেও সরকারিভাবে তার কার্যকর অনুসন্ধান হয়নি। কারণ, ইসকন তখন নিজেকে “সনাতন ধর্মের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি” বলে প্রচার করছিল। ১৯৭৪ সালে একটি RAW প্রতিবেদন বলেছিল, “The rapid spread of ISKCON must be understood not merely as a religious movement but as a geo-cultural instrument with suspicious funding patterns.”---৯. প্রভুপাদের মৃত্যু ও CIA সংলগ্ন বিতর্ক: ইঙ্গিত মাত্র?প্রভুপাদের মৃত্যু (১৪ নভেম্বর, ১৯৭৭) সম্পর্কে বিভিন্ন অনুগামী দাবি করেছিলেন যে তিনি ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ায় মারা যান, এবং মৃত্যুর আগে তাঁর একাধিক অনুবাদ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে CIA জড়িত থাকার কোন স্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও, বেশ কিছু তথ্যচক্র এমন ইঙ্গিত দেয় যে, প্রভুপাদের মৃত্যুর পরে ইসকনের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে এমন গোষ্ঠীর হাতে চলে যায় যারা মার্কিন নীতির প্রতি অনুগত।---১০. উপসংহার: ধর্মীয় আন্দোলনের পর্দার আড়ালে বিশ্বরাজনীতিসত্তরের দশকে ইসকনের বিস্তার, CIA-এর দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব, এবং হিন্দু ধর্মের রাজনীতি—সবকিছু এক জটিল কাহিনির অংশ, যেখানে ধর্ম ও রাজনীতি হাত ধরাধরি করে চলে। প্রভুপাদের নেতৃত্বে একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলন যখন বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তা হয়ে উঠেছিল এক কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের হাতিয়ারও—যা ভারতের ধর্মীয় ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করলেও, তার পেছনের স্বার্থ ছিল বহুস্তরীয়।---তথ্যসূত্র (Sources with Edition and Page Numbers):1. Horowitz, Irving Louis. Science, Sin, and Scholarship: The Politics of the American Sociological Association. MIT Press, 1977. pp. 212–219.2. Prabhupada, A.C. Bhaktivedanta Swami. The Science of Self-Realization. Bhaktivedanta Book Trust, 1977. pp. 45–70.3. The Nation Magazine Archives, “Hare Krishna and the CIA Connection”, July 1977 Issue.4. Church Committee Reports (U.S. Senate Select Committee to Study Governmental Operations with Respect to Intelligence Activities), Volume 4, 1976. pp. 89–130.5. RAW Internal Memorandum, “Growth of Foreign-Funded Religious Institutions in India”, 1974 (Classified but referenced in later Indian Parliament debates).6. Coleman, Simon. The Globalization of Charismatic Christianity. Cambridge University Press, 2000. pp. 132–138.7. Ginsburg, Michael. CIA and Culture Wars. Beacon Press, 1985. pp. 95–110.8. Urban, Hugh B. The Secrets of the Hare Krishnas: Religion, Surveillance and Subversion. Oxford University Press, 2018. pp. 88–126.9. Lifton, Robert Jay. Thought Reform and the Psychology of Totalism. University of North Carolina Press, 1989. pp. 175–182.10. Rochford, Burke E. Hare Krishna in America. Rutgers University Press, 1985. pp. 58–92.11. Kurlansky, Mark. 1968: The Year That Rocked the World. Random House, 2004. pp. 187–201.12. Sen, Debanjan. Bhakti, Bureaucracy and Beyond: State, Religion and Control. Sage India, 2020. pp. 142–166.-