গঙ্গার বুকে সাপেরা ১০

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

ব্যবস্থার আড়ালে বর্ণবাদ ​আধুনিক সমাজের এই সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো পদ্ধতিগত বর্ণবাদকে (Systemic Racism) লুকিয়ে রাখে। এই তত্ত্বের ব্যাপক প্রভাব নিচের সারসংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে: ​”(CRT) বর্ণকে একটি প্রিজম হিসেবে ব্যবহার করে যার মাধ্যমে এর সমর্থকরা আমেরিকান জীবনের সমস্ত দিক বিশ্লেষণ করে… এটি পরিচয়বাদী রাজনীতিকে (Identity Politics) সমর্থন করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি জাতি হিসেবে পুনর্কল্পনা করার চেষ্টা করে যা বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা চালিত, যেখানে প্রতিটি গোষ্ঠী নিজেদের শোষিত হিসেবে দাবি করে। বিনোদন, শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে এই তত্ত্বটি এখন সুপ্রতিষ্ঠিত, যা ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা প্রতিভার পরিবর্তে গায়ের রঙের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে উৎসাহিত করে।” ​এই তত্ত্বের মূল দাবি হলো—শ্বেতাঙ্গরা গত পাঁচশ বছর ধরে দাসপ্রথা এবং উপনিবেশবাদকে ন্যায্য প্রমাণ করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের হীনম্মন্যতার ধারণা তৈরি করেছিল। এই ধারণাগুলো সমাজের গভীরে প্রোথিত, এমনকি আমাদের ভাষাও এই কাঠামোকে শক্তিশালী করে। ​এখন প্রশ্ন হলো, এই বর্ণবাদী ইতিহাস জানার পর কী করা উচিত? হেগেল এবং মার্ক্সীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বের (Dialectic) ওপর ভিত্তি করে, ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি (CRT) তার অনুসারীদের একটি ‘প্রতিপক্ষ’ বা ‘অ্যান্টি-থিসিস’ (Anti-thesis) তৈরি করার আহ্বান জানায় যা পুরনো সব কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এটি রাজপথে সক্রিয় আন্দোলনে রূপ নেয়—যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তির নিয়ম পরিবর্তন বা সংবিধানের প্রণেতাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা। কোনো কিছুই রেহাই পাবে না। সমাজের প্রতিটি দিককে উন্মোচিত এবং ভেঙে ফেলতে হবে। যারা এই লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে না, তারা আসলে সমস্যার অংশ কারণ তারা অভিজাতদের রক্ষা করছে। ​গান্ধী এবং কালার-ব্লাইন্ডনেস ​লেখক এখানে মহাত্মা গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ বইয়ের উদাহরণ দিয়েছেন। গান্ধী যেমন বলেছিলেন যে, ব্রিটিশদের অধীনে কাজ করা ভারতীয়রাই আসলে সেই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে, CRT-ও বর্তমান ব্যবস্থার সমর্থকদের একইভাবে দেখে। ​CRT-এর প্রপোজালগুলো সেই পুরনো উদারপন্থীদের থেকে আলাদা যারা ১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং সংহতির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রথাগত উদারপন্থীরা সুবিধাবঞ্চিতদের বস্তুগত অগ্রগতির ওপর জোর দিতেন। কিন্তু CRT সমর্থকদের দাবি—নাগরিক অধিকার আইনগুলো আসলে পুরনো কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল যা শোষণকে টিকিয়ে রাখে। তাই সংস্কার নয়, বরং কাঠামো ভেঙে ফেলাই তাদের লক্ষ্য। ​রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং অন্যান্য নেতারা ‘কালার-ব্লাইন্ডনেস’ (বর্ণ-নিরপেক্ষতা) নীতিতে বিশ্বাস করতেন। এটি বলে যে, গায়ের রঙ নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে দেখা উচিত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটিকেও চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। এখন বলা হয় যে, পরিচয়ের প্রতি নিরপেক্ষ থাকা আর গ্রহণযোগ্য নয়; কারণ বিদ্যমান কাঠামোতে আগে থেকেই পক্ষপাত লুকিয়ে আছে। যদি কেউ নিজেকে ‘নিরপেক্ষ’ দাবি করে, তবে তাকে ক্ষমতা লুকিয়ে রাখার একটি মুখোশ হিসেবে দেখা হয়। ​আইন বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ডেলগাডো এবং জিন স্টেফানসিক CRT-এর অন্যতম পথিকৃৎ। তারা ব্যাখ্যা করেন কেন পুরনো উদারপন্থী চিন্তাভাবনা বর্জন করা উচিত। তাদের মতে: ​”ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি উদারপন্থার মূল ভিত্তিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলে—যেমন সমতা তত্ত্ব, আইনি যুক্তি, আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট যুক্তি এবং সাংবিধানিক আইনের নিরপেক্ষ নীতি।” ​BLM এবং ইন্টারসেকশনালিটি ​২০১৩ সালে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার (BLM) আন্দোলন শুরু হয়েছিল পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে। কিন্তু ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু আমেরিকার একটি বড় অংশকে CRT-এর দিকে ধাবিত করে। এই আন্দোলন CRT-কে আগের যেকোনো মার্ক্সীয় আন্দোলনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে। এখন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল বামপন্থীদের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন ‘ভুক্তভোগী গোষ্ঠীর’ (Victim Groups) দেশ হিসেবে দেখে। ​ইন্টারসেকশনালিটি (Intersectionality): এটি CRT-এর সাথে যুক্ত একটি বিশেষ ধারণা। কিম্বার্লে ক্রেনশ এই ধারণার প্রবর্তক। এর মূল কথা হলো—যখন একজন ব্যক্তির একাধিক পরিচয় থাকে, তখন তার সমস্যার ধরণটি সম্পূর্ণ অনন্য হয়। ​উদাহরণ: কৃষ্ণাঙ্গদের এক ধরণের সমস্যা থাকে এবং নারীদের অন্য ধরণের। কিন্তু একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী এমন সমস্যার সম্মুখীন হন যা কেবল কৃষ্ণাঙ্গ বা কেবল নারী হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। কৃষ্ণাঙ্গ সংগঠনগুলো পুরুষদের প্রাধান্য দেয় এবং নারী সংগঠনগুলো শ্বেতাঙ্গ নারীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা উভয় ক্ষেত্রেই অবহেলিত থাকে। ​পরিচয়ের রাজনীতির বিস্তার ​ইন্টারসেকশনালিটি আসার ফলে এখন একজন মানুষকে কেবল একটি পরিচয়ে (যেমন: বর্ণ বা লিঙ্গ) চেনা সম্ভব নয়। এখন অসংখ্য নতুন ‘ভুক্তভোগী পরিচয়’ তৈরি হচ্ছে। ​ক্লাসিক্যাল মার্ক্সবাদ আগে শোষিত মানুষকে ‘শ্রেণি’ (Class) হিসেবে এক করত যাতে তারা মিলেমিশে লড়াই করতে পারে। কিন্তু ইন্টারসেকশনালিটির কারণে এই গোষ্ঠীগুলো অসংখ্য ক্ষুদ্র উপদলে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। যেমন, নারীবাদ বা ফেমিনিজম এখন অনেক ভাগে বিভক্ত: ​লিবারেল ফেমিনিস্ট, মার্ক্সিস্ট ফেমিনিস্ট, র‍্যাডিকাল কালচারাল ফেমিনিস্ট, ইসলামিক ফেমিনিস্ট, ইন্ডিয়ান ফেমিনিস্ট ইত্যাদি। ​এই উপদলগুলো প্রায়ই নিজেদের মধ্যে লড়াই করে। পরিচয়ের এই ক্রমাগত বিভাজন ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়ের রাজনীতির দুয়ার খুলে দিয়েছে। এর ফলে একাডেমিক ক্ষেত্রেও এখন ‘ক্রিটিক্যাল গ্রিভেন্স স্টাডিজ’, ‘ক্রিটিক্যাল কাস্ট স্টাডিজ’ বা ‘ক্রিটিক্যাল ফ্যাট স্টাডিজ’ এর মতো বিষয় যুক্ত হচ্ছে। মুসলিমরা এখন ‘ক্রিটিক্যাল ইসলামোফোবিয়া স্টাডিজ’ শুরু করেছে নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরতে, যা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ​

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *