জিহাদ প্রসঙ্গে কিছুকথা

শরীর থেকে রক্তঝরা বন্ধ হয়ে যায়, অথবা যদি মুসলিমরা সে সময় দুর্বল ও অসমর্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু কোন সময় যদি (মুসলমানদের) হৃদয় থেকে এ ঘৃণা অন্তর্হিত হয়, সেটা হবে স্বধর্ম ত্যাগের শামিল। অবিশ্বাসীদের সম্পর্কে নবীর প্রতি সর্বশক্তিমান আল্লাহর বাণীর সত্যকার মর্মার্থ হলো— ‘হে নবী! অবিশ্বাসী ও ভণ্ডদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; তাদের প্রতি নির্মম হও। তারা দুর্ভাগা, তাদের স্থান নরকে।’ অতএব এটাই হচ্ছে আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের মূল ভিত্তি। অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে মুসলিম পরিচালিত যুদ্ধ, বিচ্ছেদ এবং ঘৃণাই আমাদের ধর্মের ভিত্তি। আমরা একে তাদের প্রতি ন্যায়বিচার ও দয়া বলেই মনে করি।​অপরদিকে জিহাদের ধর্মীয় ভিত্তি যে অমুসলিমদের প্রতি মুসলিমদের এ একমুখী ও লাগামহীন বিদ্বেষ, সে মতবাদের বিরোধিতা করেন অনেকে। বহু মধ্যপন্থী মুসলিম ও ইসলামের পণ্ডিত বলেন যে, আল-কায়েদা ও তার সমমনা ইসলামি দলগুলোর দ্বারা সংঘটিত বেপরোয়া সহিংস কর্মকাণ্ডকে অবশ্যই জিহাদ বলা যায় না। তাঁরা মনে করেন, জিহাদ হলো শান্তিপূর্ণ আধ্যাত্মিক সংগ্রাম, সহিংসতার সাথে যার কোন সম্পর্ক নেই। প্রেসিডেন্ট বুশের মতো তাঁরাও মনে করেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং এর সাথে সহিংসতার কোন সম্পর্ক নেই। অনেক অমুসলিম ইসলামি পণ্ডিতও দাবি করেন যে, ইসলামের ইতিহাসের উৎকর্ষ বা বিশুদ্ধতার চিহ্ন হলো সহনশীলতা, শান্তি ও সমতা, যা খ্রিষ্টানরা তাদের মুসলিম (যেমন স্পেনে) ও অন্যান্য অখ্রিষ্টান প্রজাদের (যেমন ইউরোপ ও আমেরিকার প্যাগান ও ইহুদি) প্রতি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।​ব্রাসেলসে ১৯-২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ ইস্ট-ওয়েস্ট ইনস্টিটিউট আয়োজিত একটি সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলনে বক্তারা দাবি করেন যে, আল-কায়েদার সহিংসতা থেকে ‘জিহাদ’ শব্দটিকে আলাদা করতে হবে। কারণ অধিকাংশ মুসলিমের মতে ‘জিহাদ’ মানে আধ্যাত্মিক একটা সংগ্রাম। অপশক্তির দ্বারা ‘জিহাদ’ শব্দটির আরও ছিনতাই হোক, সেটা তা তাঁরা চান না। সম্মেলনে ইরাকি পণ্ডিত শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘নিজ আত্মার ভেতরের সকল অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রামই হলো জিহাদ; ইসলামে কোনো جهادي সন্ত্রাসবাদ নেই।’​জিহাদ দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা বিস্তার অথবা জীবনে অত্যন্ত ইতিবাচক কিছু করার জন্য সংগ্রাম হতে পারে — এ কথার উপর জোর দিয়ে পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফস অব আর্মি স্টাফের সাবেক চেয়ারম্যান জেনারেল এহসান উল হক বলেন: ‘সন্ত্রাসবাদীদেরকে جهادي বলে আখ্যায়িত করা হলো ইসলামের উপলব্ধির ঘাটতির প্রতিফলন’ অথবা দুর্ভাগ্যবশত, ‘একটি ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার’। ৯/১১'র পর থেকে আল-কায়েদা জিহাদের নামে কোরান গাওয়া শুরু করার পর মুসলিম তথা অনেক অমুসলিম পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ জিহাদের অহিংস ধারণার পক্ষে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ড্যানিয়েল পাইপস জিহাদ অর্থের ইতিবাচক চিত্র সম্পর্কে সে সব পণ্ডিতদের বেশ কয়েকটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন, যা এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো।১​জিহাদ সম্পর্কে হার্ভার্ড ইসলামিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট জায়েদ ইয়াসিন (বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত) ২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি প্রদান অনুষ্ঠানে ‘মাই আমেরিকান জিহাদ’ শিরোনামে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘জিহাদের সত্য ও বিশুদ্ধ রূপ, যা সকল মুসলিম কামনা করে, তা হলো নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে হলেও যা সঠিক, যা ন্যায়সঙ্গত, তা-ই করা। নিজস্ব নৈতিক আচরণের জন্য এটা একটা ব্যক্তিগত সংগ্রাম।’ সে অনুষ্ঠানে হার্ভার্ডের ডীন মাইকেল শিনাজেল, ইসলাম ধর্মের উপর বিশেষ কোন জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও, জিহাদকে ন্যায় বিচারকে এগিয়ে নেওয়া এবং নিজেদেরকে ও সমাজকে জানার জন্য ব্যক্তিগত সংগ্রাম আখ্যা দিয়ে জিহাদ সম্পর্কে ইয়াসিনের ব্যাখ্যাকে স্বীকৃতি দেন। এবং হার্ভার্ড ইসলামিক সোসাইটির উপদেষ্টা প্রফেসর ডেভিড মিটেন সত্যিকারের জিহাদকে মুসলিমদের সহজাত প্রবৃত্তিকে জয়, ঈশ্বরের পথ অনুসরণ ও সমাজে ভাল কাজ করার সংগ্রাম হিসেবে বর্ণনা করেন।​মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে অনেকেই জিহাদের এ ধারণা প্রচার করছেন। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জো এলডার জিহাদকে ‘ধর্মীয় সংগ্রাম হিসাবে দেখেন, যা ধর্মের গভীর ব্যক্তিগত সংগ্রামকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত করে।’ ওয়েলসলি কলেজের অধ্যাপক রোক্সেন ইউবেন-এর কাছে জিহাদের অর্থ হলো ‘আবেগ প্রতিহত করা ও একজন শ্রেয়তর মানুষে পরিণত হওয়া’। এদিকে জর্জিয়া-সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পারসেলস্ জিহাদকে দেখেন ‘নিজের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রামরূপে’। আর্মস্ট্রং আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নেড রিনালডুক্সি'র কাছে জিহাদের লক্ষ্য হলো, ‘ভেতরে ভাল মুসলিম হওয়া ও বাহিরে একটা ন্যায় সমাজ সৃষ্টি করা’। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফরিদ এসেক-এর কাছে জিহাদের অর্থ ‘বর্ণবাদ প্রতিরোধ ও নারী অধিকারের জন্য কাজ করা’। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের বিশিষ্ট অধ্যাপক ব্রুস লরেন্স-এর কাছে জিহাদের অর্থ হলো ‘একজন ভাল ছাত্র, একজন ভাল সহকর্মী, একজন ভাল ব্যবসায়িক অংশীদার হওয়া। সর্বোপরি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা’। তাঁর মতে, এমন কি অমুসলিমরাও জিহাদের নৈতিক উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ অন্যায়পূর্ণ পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের মাধ্যমে জিহাদের উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে।​জিহাদের এ অহিংস ও মঙ্গলমুখী ধারণার বিরুদ্ধে আল-কায়েদাসহ অসংখ্য মৌলবাদী ইসলামি দল উল্লসিত চিত্তে দাবি করে যে, অবিশ্বাসীদের, বিশেষ করে পশ্চিমা ও পশ্চিম-ঘেঁষা মিত্র ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সরকারের, বিরুদ্ধে তাদের পরিচালিত সহিংস কর্মকাণ্ডই হলো জিহাদ। অনেক সময় তারা তাদের যুক্তির পক্ষে কোরান থেকে উদ্ধৃতি ও নবি মোহাম্মদের জীবনের উদাহরণ তুলে ধরে। স্পষ্টতঃ জিহাদের এ উগ্রবাদী মতবাদের ব্যাপারে যথেষ্ট মতানৈক্য বা অস্বীকৃতি রয়েছে।​একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভুল ধারণা বশত হোক বা নাই হোক, সহিংস ইসলামি দলগুলো ‘আল্লাহর রাহে যুদ্ধের’ অকাট্য বিশ্বাসে ভবিষ্যতে নারী-শিশুসহ নিরীহ মানুষের উপর সহিংসতা ও সন্ত্রাস অব্যাহত রাখবে। এজন্য মানব জীবন ও সমাজ ভোগ করবে অবর্ণনীয় ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞ। আজকের বিশ্বে প্রতিটি জাতির মধ্যে মুসলিমরা যে যথেষ্ট শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত, সে ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমদের মধ্যে উচ্চ জন্মহারের কারণে ও অতি-জনবহুল ইসলামি বিশ্ব থেকে জনপ্রবাহ বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে, জনসংখ্যার বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী, মুসলিমরা চলতি শতাব্দীর মধ্যভাগেই অনেক পশ্চিমা দেশে প্রধান ধর্মীয়...

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *