১৯৫৭ রামনদ দাঙ্গা

১৯৫৭ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভারতের তামিলনাড়ুর রামনদ জেলা এবং দক্ষিণ অংশে এক ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সংঘর্ষ মূলত ফরওয়ার্ড ব্লকের সমর্থক মারাভার এবং কুদুম্বারদের সাথে কংগ্রেস সমর্থক নাদার, কুদুম্বার এবং পাল্লারদের মধ্যে হয়েছিল। সেই বছরের মাদ্রাজ বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী একটি উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। এই দাঙ্গায় ৪২ জন দলিত নিহত হয়েছিলেন। ​পটভূমি– ​দলিতদের প্রতি আচরণ: ঔপনিবেশিক আমলে ১৯৩০-এর দশকে রামনথপুরম জেলা জাতিগত বৈষম্যের জন্য কুখ্যাত ছিল। দলিতদের উচ্চ সামাজিক মর্যাদার কোনো প্রতীক ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না ঔপনিবেশিক আমলে। তৎকালীন সেনসাস কমিশনার জে. এইচ. হাটন বর্ণনা করেছেন যে, উচ্চবর্ণের পক্ষ থেকে দলিতদের ওপর গয়না পরা এবং শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ আটটি কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ১১টি কঠোর নিয়ম আরোপ করে এই ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়। ​দলিতদের উত্থান: ১৯৩০-এর দশকে খ্রিস্টান মিশনারিদের সহায়তায় দলিতরা শিক্ষিত এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী হতে শুরু করে। চাকরি এবং শিক্ষার সুযোগ পাওয়ায় তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন হয়। অন্যদিকে, থেভাররা শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল এবং তৎকালীন সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা পরিবর্তিত গণতান্ত্রিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছিল না। ইমানুয়েল সেকারানের মতো নেতাদের নেতৃত্বে দক্ষিণ জেলাগুলোতে দলিতদের মধ্যে অধিকার সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ​নির্বাচন– ​১৯৫৭ সালের লোকসভা ও মাদ্রাজ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ‘কংগ্রেস রিফর্ম কমিটি’ (CRC) গঠিত হয় এবং তারা ইউ. মুথুরামালিঙ্গম থেভারের ‘অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক’ (AIFB)-এর সাথে সহযোগিতা শুরু করে। মুথুরামালিঙ্গম থেভার একইসাথে সংসদীয় এবং বিধানসভা উভয় আসনে জয়লাভ করেন। পরে তিনি সংসদীয় আসনটি রেখে দিলে মুদুকুলাথুর বিধানসভা আসনে উপ-নির্বাচন হয়। ১ জুলাইয়ের এই উপ-নির্বাচনে ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী টি.এল. শশীবর্ণ থেভার জয়ী হন। এরপর থেকেই থেভার এবং পাল্লার সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা শুরু হয়। ​দাঙ্গার ঘটনাবলি– ​১০ সেপ্টেম্বর: শান্তি বজায় রাখার জন্য রামনদ জেলা সংগ্রাহক (Collector) একটি শান্তি বৈঠকের আয়োজন করেন। এতে মুথুরামালিঙ্গম থেভার, ইমানুয়েল সেকারান এবং অন্যান্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়নি। ​১১ সেপ্টেম্বর: শান্তি বৈঠকে অংশ নেওয়া কংগ্রেস প্রতিনিধি ইমানুয়েল সেকারানকে পরমহকুড়িতে হত্যা করা হয়। ​১৩ সেপ্টেম্বর: আরুমকুলামে সংঘর্ষে ৮ জন নিহত হন। ​১৪ সেপ্টেম্বর: ইমানুয়েল সেকারান হত্যা মামলার সন্দেহভাজনদের ধরতে পুলিশ কীলথুভাল গ্রামে প্রবেশ করলে পুলিশের গুলিতে ৫ জন থেভার নিহত হন। ​১৬-২১ সেপ্টেম্বর: সহিংসতা বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। বীরম্বল, ইরুলানদাপট্টি এবং সান্দাকোট্টাইসহ বিভিন্ন স্থানে পাল্লার ও থেভারদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গির্জায় আশ্রয় নেওয়া মানুষের ওপরও হামলা চালানো হয়। ​২৮-২৯ সেপ্টেম্বর: মুথুরামালিঙ্গম থেভারকে গ্রেফতার করা হয়, যদিও পরবর্তীতে আদালত তাকে সমস্ত অভিযোগ থেকে খালাস করে দেয়। ​২১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে এবং নতুন কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *