আরব্যরজনী-পাঠপ্রতিক্রিয়া ১

আরবের বেদুইনদের মধ্যে যারা লুটতরাজ করতো তাদের বাদাবী দস্যু বলা হতো।তাদের একজন নেতা থাকতো যাদের শেখ বলা হতো।তারা শেখদের মেনে নিতে রাজি থাকতো না কিন্তু শেখরা জোর করেই আধিপত্য চালাত।তাদের সওদাগর সমিতি থাকতো।তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিল,গণতান্ত্রিক ভাবে সদাগর সমিতির সদস্য নির্বাচন করা হতো।মদ খাওয়া,বাঈজী নাচ,জুয়া খেলা সব ই চলতো,ব্যভিচার ও চলতো।যুদ্ধবন্দী নারীদের বলাৎকার নিন্দনীয় ছিল না।অতিথিদের খুব সমাদর করতো।তারা খলিফাদের মেনে চলতো,ধর্মগুরু,যুদ্ধ নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।হারুন আল রশীদের খুব গুরুত্ব ছিল। ​যুদ্ধবন্দী হলে তার ওপর বলাৎকারের করার ব্যাপার সমাজে নিন্দনীয় ছিল না। আরব্য রজনী গ্রন্থেও এরকম ঘটনার বহু উদাহরণ দেখা যায়। ​আলোচ্য গ্রন্থের বহু গল্পে ‘মেহমান’ অর্থাৎ অতিথির প্রতি বিশেষ সমাদরের উল্লেখ দেখা যায়।অতিথিদের সন্তুষ্ট করতে গৃহকর্তা সাধ্যমত চেষ্টায় ব্রতী হত। অতিথিদের অমর্যাদা, অনাদর ও অবহেলা আরব-সমাজে বিশেষ পাপ বলে বিবেচিত হত।অতিথিদের সন্তোষ উৎপাদনের জন্য গৃহকর্তা নিজের প্রাণ দিতেও পিছপা হতো না। অবশ্য এখনও তাদের সমাজে অতিথি পরম সমাদর লাভ করে থাকে। ​আরব্য রজনীর কাহিনীতে বার বার খলিফাদের, বিশেষ করে খলিফা হারুণ-অল-রশীদের কথা নানাভাবে উল্লেখ দেখা যায়। কোন এক সময়ে খলিফারা ইসলাম বিজয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরা যে কেবল মাত্র ধর্মগুরু হিসাবেই সমাজে পরিগণিত ছিলেন তা নয়। বরং বলা চলে, তাঁরা একাধারে যেমন ধর্মীয় ক্রিয়া কাণ্ডের নির্দেশাদি দান করতেন তেমনি অপরদিকে রাষ্ট্রনায়ক হিসাবেও যথেষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতেন। ​ধর্মগুরু হজরত মহম্মদের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। ফলে তিনি ইহলোক ত্যাগ করলে আরব রাজ্যের ধর্মীয় ক্রিয়া কাণ্ড পরিচালনা এবং রাষ্ট্রশাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা কার ওপর অর্পণ করা যেতে পারে তা নিয়ে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। অবশেষে সমস্যা সমাধানের জন্য আরব মুলুকের নেতৃস্থানীয় ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা একমত হয়ে হজরত মহম্মদ-এর প্রধান শিষ্য আবু বকরকে খলিফার পদে অভিষিক্ত করলেন। ​আবু বকরের পর খলিফার পদ লাভ করেন যথাক্রমে ওমর, উমান এবং আলী। আলীর পরে খলিফার পদে অধিষ্ঠিত হন মোয়াবিয়া। তিনি বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি বাইজেন্টীয়ান সাম্রাজ্য আক্রমণ করে উত্তর-আফ্রিকা জয় করেন। ​হারুণ-অল-রশীদ ছিলেন আব্বাসীয় বংশোদ্ভূত। ইতিহাসে তাঁকে শ্রেষ্ঠ খলিফা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আলোচ্য আখ্যায়িকায়ও একই বক্তব্য সমর্থন করা হয়েছে। বাগদাদ ছিল তাঁর রাজধানী। তিনি যেমন ছিলেন একজন সুশাসক ও প্রজাদরদী তেমনি একজন বীর যোদ্ধা বলে সমগ্র আরব দুনিয়ায় তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তাঁর আমলে খিলাফৎ সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি সর্বাধিক হয়েছিল। টাইগ্রিস নদীর তীরবর্তী তার রাজধানী বা বাগদাদ নগরটি ঐশ্বর্য ও শিল্প সম্পদে বিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ​আলোচ্য গ্রন্থে খলিফা হারুণ-অল-রশীদের অগাধ ঐশ্বর্য ও জাঁকজমকের বিশেষ বিবরণ পাওয়া যায়।বলা হয় তিনি তার উজির জাফর আর দেহরক্ষী মাসবুরকে নিয়ে প্রজাদের জীবন যাত্রা প্রণালী, সুখ-দুঃখ, সুবিধা- অসুবিধা নিজের চোখে দেখার জন্য প্রায় প্রতি রাত্রেই ছদ্মবেশ ধারণ করে নগর পরিদর্শনে বেরোতেন। ​ইতিহাস বলে, মানি(আরব্য রজনী অনুসারে মহম্মদের নাম বলা হয়েছে মানি) নামধারী মদিনা নিবাসী এক প্রবীণ ফকির দরবেশ নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ পয়গম্বর বলে প্রচার করেন। তিনি তাঁর অনুগামীদের মধ্যে প্রচার করেন যে, তাঁর প্রবর্তিত ইসলাম ধর্মই বিশ্বের প্রচারিত ধর্মগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং যথার্থ ধর্ম। ​এক সময় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একজন জ্ঞানী ও লব্ধ প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ছিলেন ঈশদ। সত্যসন্ধানী ব্যক্তি হিসাবে তাঁর খ্যাতি তামাম আরব দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি একবার কর্তব্য নির্ধারণ করতে গিয়ে হতাশার সঙ্গে বলেছিলেন ‘আমি কত ঈশ্বরের উপাসনায় নিজেকে লিপ্ত রাখব ‘এক ঈশ্বর, নাকি বহু ঈশ্বর?’ ​‘ইসলাম’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ-র কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করা। এ ধর্মে ও মতে যারা বিশ্বাসী তারাই সমাজে মুসলিম বা মুসলমান বলে পরিচিত। ​হজরত মহম্মদ মুসলিম রাষ্ট্রে এবং ইসলামের প্রধান ব্যক্তিত্বরূপে চিহ্নিত হন। আর মক্কা ইসলামের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা এ স্থানটিকে অতি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। ​ আরব্য রজনী গ্রন্থে বহু বিদেশী শব্দ যেমন আরবী শব্দ আলখেল্লা, আরবি, আলাদা, আক্কেল, আয়েশ, আতরদান, ইজারা, ইজ্জৎ, উশুল, উকিল, ওস্তাদ, একতিয়ার, এলাকা, এলেম, কত্তা, কবুল, কয়েদী, আষাঢ়, কিতাব, কিয়ান, গলদ, তমাশ, তসবির, দৌলত, দুনিয়া, দোস্ত বা, খবব্রত, হামাম, আদৎ, পয়মাল, গোসল, গোসসা প্রভৃতি। আবার কিছু ফারসি শব্দও ব্যবহার করা হয়েছে যেমন—ফতুর, দেওয়ানা, আওয়াজ, মালিশ, হাকিম, হারাম, মালুম প্রভৃতি। আর আলখাল্লা, উজবুক, বিবি, চামচি (চামচে) প্রভৃতি তুর্কী শব্দও কাহিনী ব্যক্ত করতে গিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত আলিফ লায়লা বা আরব্য রজনীর গল্প বহু বার অনূদিত হয়েছে তার মধ্যে ড.জে.সি.মাদ্রুস এর গ্রন্থখানি ই সবথেকে বেশী গ্রহণযোগ্য।অন্য আরেকজন অনুবাদকার স্যার আর বার্টনের অনুবাদ করা বইটিও যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য।তবে আসল লেখার থেকে অনেক পার্থক্য উভয়ের লেখাতেই কারণ আসল লেখা প্রচন্ড দুর্বোধ্য,জটিল ও রহস্যময় ফলে অনুবাদ করা সম্ভব হয়নি করলেও মানুষ বুঝত না। আলিফ লায়লা প্রবল ভাবে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য।এতে যৌনতা নিয়ে এমন বর্ণনা আছে তা শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্করা ই পড়তে পারে।এই বই এর কাহিনী শুরু হয় — বাদশাহ শাহরিয়ার এর অনুজ সমরখন্দ এর অধিপতি শাহজামান হঠাৎ আবিষ্কার করলেন তার বেগম তারই রান্নাঘরের এক নিগ্র পাঁচকের সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত।এই দৃশ্য দেখে তার মাথায় রক্ত উঠে যায় এবং দু জনকেই দ্বিখন্ডিত করে ফেলেন।এরপর শাহজামান প্রাসাদে ফিরে এলেন কিন্তু খুব বিষন্ন থাকতেন।একদিন শাহরিয়ার শিকারে যান শাহজামানকে যেতে বলার পরও তিনি সাথে গেলেন না। দুঃখী মনে বিনিদ্র ভাবে জানালার সামনে বসে ছিলেন।এক সময় দেখলেন শাহরিয়ারের খুব সুন্দরী বেগম এক দৈত্যাকৃতি নিগ্র প্রেমিকের সঙ্গে ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়।এই দৃশ্য দেখে তার মনের বিষন্নতা অনেকটাই দূর হয়। তার মনে হয় শুধু তার বেগম ই না,নারী জাতি ই বিশ্বাসঘাতিনী ও ছলনাময়ী।তাহলে তিনি কেন বিষাদগ্রস্ত থাকবেন?পরের দিন শাহরিয়ার শিকারে থেকে ফিরে এসে শাহজামানের এমন পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলে তিনি ঘটনাটি জানালেন।শাহজামান বিশ্বাস করলেন না তখন শাহরিয়ার তাকে আবার শিকার যাওয়ার কথা বলে প্রাসাদে থেকে দেখতে বললেন।এমন ই করলেন শাহজামান এবং দেখলেন তার বেগম এক নিগ্রোর সাথে ভাভিচারে লিপ্ত হলেন।এতে ক্রোধান্বিত হয়ে তিনি তার বেগমকে হত্যা করলেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন কোন নারীকে আর ব্যাভিচার করতে দেবেন না আর প্রতি রাতে একজন করে কুমারী মেয়ে তার বেগম হয়ে প্রাসাদে আসবে।তিনি সারারাত্রি তাকে ভোগ করবেন এবং ভোর হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করবেন।এভাবে চলতে চলতে এক সময় দেশে কুমারী মেয়ে নিঃশেষ হলো।শুধুমাত্র অবশিষ্ট ছিল তার উজিরের মেয়ে শাহরাজাদ।তার মেয়ের পরিণতি ভেবে উজির দুঃখী হয়ে গেলেন।সেটা বুঝতে পেরে শাহরাজাদ তাকে সান্ত্বনা দিলেন।কি ভাবে নিজেকে বাদশাহের তরবারি থেকে রক্ষা করবেন সেই কৌশল তার জানা আছে একথা বললেন।তবুও বৃদ্ধ উজির ভয়ে ভয়ে তার মেয়ে শাহরাজদকে নিয়ে প্রাসাদে বাদশাহের হাতে তুলে দিয়ে এলেন।বাদশাহ শাহরিয়ারের শয্যায় শুয়ে শাহরাজাদ অঝোরে কাঁদতে থাকলেন তখন তাকে বাদশাহ কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন তার এক ছোট বোন আছে রাত পোহাবার আগে তাকে কিছু সময় নিজের কাছে রাখতে চান।বাদশাহের আদেশে উজিরের প্রাসাদ থেকে তার কনিষ্ঠ কন্যা দুনিয়াজাদকে নিয়ে আসা হলো।দুনিয়াজাদ তার বড় বোনের কাছে গল্প শোনানোর জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করলেন।শাহারজাদ তখন বাদশাহের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে গল্প বলা শুরু করলেন।তার গল্প শুনে বাদশাহ ও অভিভূত হয়ে গেলেন কিন্তু গল্প শেষ হওয়ার আগেই ভোর হয়ে গেল কিন্তু গল্পটির শেষ পর্যন্ত না শুনে বাদশাহ তাকে হত্যা করতে চাইলেন না।শাহারজাদ এভাবে গল্প শোনাতে শোনাতে হাজার এক রজনী গল্প বলার পর থামলেন।বাদশাহ শাহরিয়ার ও শাহারজাদের এই গল্প বলা আর শোনার মধ্যবর্তী সময়ে তাদের তিনটে পুত্র সন্তান জন্মলাভ করলো।গল্প শুনিয়ে খুশী করার বিনিময়ে শাহারজাদ বাদশাহের কাছে কিছু পুরস্কার চাইলেন,বাদশাহ ও দিতে রাজি হলেন।বেগম শাহারজাদ তখন তিন শিশু পুত্রকে বাদশাহের সামনে এনে বললেন,”জাহাপনা শুধু গল্প শুনিয়ে আপনাকে আমি খুশী করিনি তার সাথে আপনার তিন সন্তানের ও জন্ম দিয়েছি।এসবের বিনিময়ে আমি এখন আমার প্রাণ ভিক্ষা চাইছি।তাও আমার নিজের জন্য না,এই শিশুদের জন্য আমি বাঁচতে আগ্রহী।আমার অবর্তমানে ওরা অনাথ হয়ে যাবে।বাদশাহ শাহারজাদের অনুরোধ মানলেন এবং সমরখন্দ থেকে ছোট ভাই শাহজামানকে ডেকে নিয়ে আসলেন।কাজী সাহেব বাদশাহ শাহরিয়ার ও শাহারজাদের এবং শাহজামান ও দুনিয়াজাদের শাদীর শাদীনামা তৈরী করলেন, জাঁকজমকের সাথে তাদের শাদী হয়ে গেল। বাদশাহ শাহরিয়ার তার দরবারের অনুলেখককে বেগম শাহারজাদ কথিত হাজার এক রজনীর গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য আদেশ দিলেন,এভাবেই আরব্য রজনী তৈরী হলো। ​

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *