খ্রীষ্ঠান দ্বারা বিধর্মীদের অত্যাচার

বাইবেলে পৌত্তলিক বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি যে কঠোর নির্দেশনা ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর বিবরণ রয়েছে,সেই তিনটি প্রধান বিষয় নিয়ে নীচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো: ১. নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুদ্ধ বা ঘটনা ওল্ড টেস্টামেন্টে বা পুরাতন নিয়মে ইস্রায়েলীয়দের সাথে পার্শ্ববর্তী পৌত্তলিক জাতিগুলোর বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে। এগুলো কোনো সাধারণ রাজনৈতিক যুদ্ধ ছিল না, বরং বাইবেলের ভাষায় এগুলো ছিল “ঈশ্বরের যুদ্ধ” (Wars of the Lord)। জেরিকোর যুদ্ধ (Battle of Jericho): বুক অফ যিহোশূয় (Book of Joshua)-এ বর্ণিত হয়েছে কীভাবে ইস্রায়েলীয়রা জেরিকো শহরের দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। ঈশ্বরের নির্দেশনা অনুযায়ী, তারা শহরের ভেতরের সমস্ত পুরুষ, নারী, শিশু এবং গবাদিপশু তলোয়ারের আঘাতে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। কেবল রাহাব নামের এক নারী ও তার পরিবারকে রক্ষা করা হয়েছিল, কারণ সে ইস্রায়েলীয় গুপ্তচরদের সাহায্য করেছিল। অমালেকীয়দের (Amalekites) বিরুদ্ধে যুদ্ধ: রাজা শৌলকে (Saul) নবী শমূয়েল ঈশ্বরের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছিলেন অমালেকীয় জাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার জন্য। নির্দেশটি ছিল অত্যন্ত কঠোর—”তাদের সমস্ত কিছু ধ্বংস করো, কাউকে দয়া করো না; পুরুষ ও নারী, শিশু ও দুগ্ধপোষ্য শিশু, গরু ও ভেড়া, উট ও গাধা সব হত্যা করো” (১ শমূয়েল ১৫:৩)। এই নির্দেশ অমান্য করে শৌল অমালেকীয় রাজাকে জীবিত রাখায় ঈশ্বর তার ওপর অসন্তুষ্ট হন। এলিয় এবং বালের পুরোহিতদের ঘটনা: কার্মেল পর্বতের এক বিখ্যাত দ্বন্দ্বে ভাববাদী এলিয় প্রমাণ করেন যে ইস্রায়েলের ঈশ্বরই সত্য ঈশ্বর এবং ‘বাল’ (Baal) দেবতা মিথ্যা। এরপর এলিয় উপস্থিত জনতাকে আদেশ দেন বালের ৪৫০ জন পুরোহিতকে বন্দী করতে এবং তিনি নিজে তাদের কীশোন নদীতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেন। ২. ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বা প্রেক্ষাপট এই আধুনিক যুগে বাইবেলের এই কঠোর আয়াতগুলো এবং হত্যাকাণ্ডগুলোকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর মনে হতে পারে। তবে ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদরা এই ঘটনাগুলোর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ও আত্মিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন: তৎকালীন কনানীয়দের চরম অনৈতিকতা: বাইবেল অনুযায়ী, কনান অঞ্চলের জাতিগুলো কেবল ভিন্ন দেবতার পূজাই করত না, বরং তাদের ধর্মীয় আচারগুলো ছিল অত্যন্ত জঘন্য। তারা “মোলক” (Molech) দেবতার উদ্দেশ্যে নিজেদের জ্যান্ত সন্তানদের আগুনে পুড়িয়ে নরবলি দিত। এছাড়া তাদের উপাসনালয়গুলোতে ধর্মীয় বেশ্যাবৃত্তি এবং চরম অনৈতিক যৌনাচার প্রচলিত ছিল। বাইবেলের ব্যাখ্যায়, এই ধ্বংসলীলা ছিল মূলত তাদের শত বছরের পাপের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের এক স্বর্গীয় বিচার (Divine Judgment)। ইস্রায়েলের আত্মিক বিশুদ্ধতা রক্ষা: ইস্রায়েলীয়দের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বেছে নেওয়া হয়েছিল—যেন তারা এক ঈশ্বরবাদের (Monotheism) বার্তা পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখে। ঈশ্বর জানতেন যে পৌত্তলিক জাতিগুলো বেঁচে থাকলে ইস্রায়েলীয়রা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হবে, মূর্তি পূজা শুরু করবে এবং নিজেদের নৈতিকতা হারিয়ে ফেলবে। তাই আত্মিক “সংক্রমণ” ঠেকাতে এই কঠোর নির্মূলকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিধান: খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, এই শারীরিক যুদ্ধ এবং ধ্বংসের আদেশগুলো ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কালখণ্ডের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। এটি কোনো চিরন্তন নিয়ম নয়। ৩. রোমান সাম্রাজ্য দ্বারা খ্রিস্টানদের ওপর অত্যাচার এটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যেখানে বাইবেলের ইস্রায়েলীয়রা আর আক্রমণকারী নয়, বরং প্রথম শতাব্দীর খ্রিস্টানরা নিজেরা “বিধর্মী” বা পৌত্তলিক রোমান সাম্রাজ্য দ্বারা চরম অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হয়। অত্যাচারের কারণ: রোমান সাম্রাজ্যে বহু দেবতার পূজা করা হতো এবং সম্রাটকে ঈশ্বর বা দেবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার নিয়ম ছিল। খ্রিস্টানরা এক ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী হওয়ায় সম্রাটের পূজা করতে বা রোমান দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দিতে অস্বীকার করে। রোমানরা এটিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করে। সম্রাট নিরোর (Nero) নিষ্ঠুরতা (৬৪ খ্রিস্টাব্দ): রোমে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সম্রাট নিরো এর দায় খ্রিস্টানদের ওপর চাপিয়ে দেন। ঐতিহাসিক ট্যাসিটাসের মতে, খ্রিস্টানদের পশুর চামড়া পরিয়ে শিকারী কুকুর দিয়ে খাওয়ানো হতো, ক্রুশে দেওয়া হতো এবং রাতের অন্ধকারে নিরোর বাগানে আলো জ্বালানোর জন্য খ্রিস্টানদের শরীরে আগুন ধরিয়ে মশাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এই সময়েই যিশুর প্রধান দুই শিষ্য—পিটার (পিতর) এবং পল (পৌল) রোমে শহীদ হন। কলোসিয়ামে হত্যাকাণ্ড: পরবর্তী ৩০০ বছর ধরে (বিশেষ করে সম্রাট ডোমিসিয়ান, ট্রাজান, মার্কাস অরেলিয়াস এবং ডিওক্লেশিয়ানের আমলে) খ্রিস্টানদের ওপর পর্যায়ক্রমিক অত্যাচার চলে। রোমান কলোসিয়াম এবং অন্যান্য থিয়েটারে হাজার হাজার খ্রিস্টানকে হিংস্র পশুর (সিংহ, চিতা) সামনে ছেড়ে দেওয়া হতো বিনোদনের জন্য। তারা চাইলে রোমান দেবতাদের উদ্দেশ্যে ধূপ জ্বালিয়ে জীবন ভিক্ষা পেতে পারত, কিন্তু তারা বিশ্বাসের জন্য মৃত্যুকে বেছে নিত। অত্যাচারের অবসান (৩১৩ খ্রিস্টাব্দ): এই চরম অত্যাচার সত্ত্বেও খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার থামানো যায়নি। অবশেষে সম্রাট কনস্টানটাইন ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে “মিলানের ডিক্রি” (Edict of Milan) জারি করে খ্রিস্টধর্মকে রোমান সাম্রাজ্যে আইনি স্বীকৃতি দেন এবং অত্যাচারের অবসান ঘটান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *