সহিহ বুখারির ওহীর সূচনা অধ্যায়ের ৫, ৬ ও ৭ নম্বর হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় এসেছে। প্রথমদিকে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ কীভাবে ওহি গ্রহণ করতেন। এরপর বলা হয়েছে, রমজানে জিবরীল তাঁর সঙ্গে কুরআন পাঠ করতেন। তারপর দীর্ঘ একটি হাদিসে হিরাক্লিয়াস, আবু সুফিয়ান এবং মুহাম্মদের পাঠানো চিঠির ঘটনা এসেছে।৫ নম্বর হাদিসে ইবন আব্বাস বলেন, যখন জিবরীল ওহি নিয়ে আসতেন, তখন মুহাম্মদ দ্রুত তা মনে রাখার চেষ্টা করতেন। এজন্য তিনি ঠোঁট নাড়াতেন। তখন কুরআনের এই কথা নাজিল হয় যে, ওহি দ্রুত মনে রাখার জন্য জিহ্বা নাড়ানোর দরকার নেই; আল্লাহ নিজেই তা তাঁর অন্তরে সংরক্ষণ করবেন এবং তাঁকে তা পড়িয়ে দেবেন।এর মানে এই নয় যে মুহাম্মদ পরে মুখে কুরআন পড়তেন না। অর্থ হলো, জিবরীল যখন ওহি পড়ে শোনাচ্ছেন তখন মুহাম্মদকে সঙ্গে সঙ্গে মুখস্থ করার জন্য তাড়াহুড়ো করতে হবে না। তাঁকে আগে মন দিয়ে শুনতে হবে। জিবরীল চলে যাওয়ার পর তিনি সেই ওহি ঠিকভাবে পড়তে পারবেন।৬ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, রমজান মাসে জিবরীল প্রতি রাতে মুহাম্মদের সঙ্গে দেখা করতেন। তাঁরা কুরআন একে অপরকে পড়ে শোনাতেন। এখানে কুরআন জিবরীলের কাছেও নাজিল হচ্ছিল—এমন কথা বলা হয়নি। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, জিবরীল আল্লাহর কাছ থেকে ওহি নিয়ে মুহাম্মদের কাছে আসতেন। এরপর জিবরীল ও মুহাম্মদ কুরআন পড়ে তা যাচাই ও পুনরালোচনা করতেন।৭ নম্বর হাদিসের ঘটনা আরও বড়। তখন আবু সুফিয়ান কুরাইশের একটি ব্যবসায়ী দলের সঙ্গে সিরিয়ায় ছিলেন। মুহাম্মদ ও কুরাইশদের মধ্যে তখন একটি নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি চলছিল। সেই সময় বাইজেন্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে ডেকে পাঠান।হিরাক্লিয়াস প্রথমে জানতে চান, মুহাম্মদের সঙ্গে বংশের দিক থেকে সবচেয়ে কাছের ব্যক্তি কে। আবু সুফিয়ান বলেন, তিনি নিজেই সবচেয়ে কাছের। এরপর হিরাক্লিয়াস তাঁকে সামনে বসিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকেন।তিনি জানতে চান, মুহাম্মদের বংশ কেমন। আবু সুফিয়ান বলেন, তিনি সম্মানিত বংশের মানুষ।হিরাক্লিয়াস জানতে চান, এর আগে তাঁদের মধ্যে কেউ এমন কথা বলেছে কি না। আবু সুফিয়ান বলেন, না।তিনি জানতে চান, মুহাম্মদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোনো রাজা ছিলেন কি না। উত্তর ছিল, না।তারপর জানতে চান, তাঁর অনুসারীরা সমাজের বড় ও ধনী লোক, নাকি সাধারণ ও দুর্বল লোক। আবু সুফিয়ান বলেন, সাধারণ ও দুর্বল লোকই বেশি তাঁর অনুসারী হয়েছে।হিরাক্লিয়াস আবার জানতে চান, তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছে না কমছে। আবু সুফিয়ান বলেন, বাড়ছে।তিনি জানতে চান, কেউ ইসলাম গ্রহণ করার পর আবার ধর্ম ছেড়ে দেয় কি না। আবু সুফিয়ান বলেন, তিনি এমন কাউকে জানেন না।এরপর প্রশ্ন আসে, মুহাম্মদ নবী হওয়ার দাবি করার আগে তাঁকে কখনো মিথ্যাবাদী বলা হতো কি না। আবু সুফিয়ান বলেন, না।হিরাক্লিয়াস জানতে চান, মুহাম্মদ চুক্তি ভঙ্গ করেন কি না। আবু সুফিয়ান বলেন, না। তবে তিনি এটাও বলেন যে তাঁদের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি চলছে এবং ভবিষ্যতে মুহাম্মদ কী করবেন, তা তাঁরা জানেন না।সবশেষে হিরাক্লিয়াস জানতে চান, মুহাম্মদ কী শিক্ষা দেন।আবু সুফিয়ান বলেন, তিনি এক আল্লাহর উপাসনা করতে বলেন। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে নিষেধ করেন। পূর্বপুরুষদের প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি সালাত, সত্য কথা বলা, চরিত্র ভালো রাখা এবং আত্মীয়দের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দেন।এই অংশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে মুহাম্মদের ধর্মীয় বক্তব্যের একটি পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়। তিনি আরবদের প্রচলিত বহু দেবতার উপাসনা গ্রহণ করেননি। তিনি এক আল্লাহর উপাসনার কথা বলেছেন এবং অন্য উপাস্যদের প্রত্যাখ্যান করতে বলেছেন।‘পূর্বপুরুষরা যা করত তা ছেড়ে দাও’—এই কথার অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পুরনো আরব ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূর্তি-উপাসনার বিরোধিতা করা হয়েছিল। তাই ইসলামের শুরু থেকেই আরবের প্রচলিত ধর্মের সঙ্গে ইসলামের সরাসরি ধর্মীয় সংঘাত ছিল।তবে এখান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে মুহাম্মদ প্রত্যেক মানুষকে অস্ত্রের জোরে ইসলাম গ্রহণ করিয়েছিলেন। এই হাদিসে এমন কোনো ঘটনা নেই। এখানে শুধু তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা কী ছিল, তা বলা হয়েছে।হিরাক্লিয়াস এরপর আবু সুফিয়ানের উত্তরগুলো নিয়ে নিজের মত দেন। তিনি বলেন, সাধারণত নবীরা তাঁদের জাতির সম্মানিত বংশ থেকে আসেন। যদি এর আগে কেউ একই কথা বলে থাকত, তাহলে তিনি ভাবতেন মুহাম্মদ আগের কারও কথা অনুসরণ করছেন। যদি তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে রাজা থাকতেন, তাহলে মনে হতে পারত তিনি পূর্বপুরুষের রাজত্ব ফিরে পেতে চাইছেন।কিন্তু এসব কিছুই নেই।হিরাক্লিয়াস মুহাম্মদের চরিত্রের বিষয়টিও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে মিথ্যা বলে না, সে আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলবে—এটা সহজে বিশ্বাস করা যায় না।এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। আবু সুফিয়ান তখন মুহাম্মদের বিরোধী ছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, সুযোগ পেলে তিনি মুহাম্মদ সম্পর্কে মিথ্যা বলতে পারতেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে থাকা লোকেরা যেন পরে তাঁকে মিথ্যাবাদী না বলে, সেই কারণে তিনি সত্য কথাই বলেছেন।তাই হাদিসের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রশ্নোত্তরে আবু সুফিয়ান মুহাম্মদের প্রশংসা করার জন্য বসেননি। তিনি বিরোধী পক্ষের মানুষ হয়েও কিছু তথ্য স্বীকার করেছিলেন।হিরাক্লিয়াস বলেন, নবীদের অনুসারীদের মধ্যে সাধারণ ও দুর্বল মানুষ বেশি থাকে। অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকা এবং ধর্মে ঢোকার পর সহজে বের না হওয়াকেও তিনি নবীর দাবির পক্ষে লক্ষণ হিসেবে দেখেন।এখানে ‘দুর্বল মানুষ’ কথাটিকে সরাসরি ‘নীচু জাত’ বলা ঠিক হবে না। আরব সমাজে বংশ, গোত্র, সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য ছিল। কিন্তু ভারতীয় জাতিভেদের সঙ্গে সেটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়।মুহাম্মদ কুরাইশের সম্মানিত হাশিমি বংশের মানুষ ছিলেন। কাবার সঙ্গে কুরাইশদের বিশেষ সম্পর্কও ছিল। কিন্তু এই কারণে ‘ইসলামে ভারতীয় ধরনের জাতিভেদ আছে’—এমন সিদ্ধান্ত এই হাদিস থেকে সরাসরি পাওয়া যায় না।এরপর হিরাক্লিয়াস বলেন, যদি আবু সুফিয়ানের কথা সত্য হয়, তাহলে মুহাম্মদের ক্ষমতা তাঁর নিজের পায়ের নিচের জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাবে। তিনি বলেন, তিনি জানতেন যে একজন নবী আসবেন, কিন্তু ভাবেননি যে তিনি আরবদের মধ্য থেকে আসবেন।তিনি আরও বলেন, যদি তিনি মুহাম্মদের কাছে পৌঁছতে পারতেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য কষ্ট স্বীকার করতেন। এমনকি তাঁর পা ধুয়ে দিতেন বলেও বর্ণনায় এসেছে।এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে—হিরাক্লিয়াস যদি এতটা বিশ্বাস করতেন, তাহলে তিনি নিজে মুসলমান হলেন না কেন?সহিহ বুখারির এই হাদিসে হিরাক্লিয়াস সরাসরি বলেননি, ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম।’ তাই শুধু এই হাদিসের ভিত্তিতে তাঁকে মুসলমান বলা যায় না।তবে হাদিসের বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি মুহাম্মদের দাবিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর দাবির পক্ষে অনেক যুক্তি দেখতে পেয়েছিলেন। পরে তিনি নিজের রাজ্যের বড় নেতাদের সামনে মুহাম্মদকে অনুসরণ করার কথা তুলেছিলেন।সেখানেই ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।হিরাক্লিয়াস রোমের নেতাদের এক জায়গায় ডেকে আনেন। দরজা বন্ধ করে তিনি তাঁদের বলেন, তাঁরা কি নিজেদের মঙ্গল, হিদায়াত এবং রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চান? যদি চান, তাহলে এই নবীর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করুন।এ কথা শুনে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে দরজার দিকে ছুটে যান। কিন্তু দরজা বন্ধ ছিল।এখানে প্রশ্ন হতে পারে—হিরাক্লিয়াস কি তাঁদের জোর করে ইসলাম গ্রহণ করাতে চেয়েছিলেন?হাদিসে এমন কোনো কথা নেই যে তিনি তাঁদের মারধর করেছিলেন বা হত্যা করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে দরজা বন্ধ করে তাঁদের সামনে এমন একটি প্রস্তাব দেওয়া অবশ্যই একটি কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তাঁরা স্পষ্টভাবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে চাননি।তখন হিরাক্লিয়াস তাঁদের আবার ফিরিয়ে আনেন এবং বলেন, তিনি আসলে তাঁদের পরীক্ষা করছিলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের ধর্মের প্রতি কতটা দৃঢ়।এরপর তাঁরা হিরাক্লিয়াসের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে সিজদা করেন।এই সিজদাকে মুহাম্মদকে সিজদা করা বলা যাবে না। বরং বর্ণনার ধারায় তাঁরা হিরাক্লিয়াসের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছিলেন।তাহলে কি হিরাক্লিয়াস মুসলমান ছিলেন?এই হাদিস থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বলা যায়, তিনি মুহাম্মদের দাবি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন এবং তাঁর দাবিকে সত্য বলে মনে করার মতো অনেক কারণ দেখেছিলেন। কিন্তু প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করার কথা হাদিসে নেই।এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ইবন আবি কাবশা’ নামটি।আবু সুফিয়ান হিরাক্লিয়াসের দরবার থেকে বের হওয়ার পর বলেন, ‘ইবন আবি কাবশার ব্যাপার শক্তিশালী হয়ে গেছে; রোমের রাজাও তাকে ভয় করছে।’এখানে ‘ইবন আবি কাবশা’ মুহাম্মদের আসল পিতৃপরিচয় নয়। এটি তাঁকে বিদ্রূপ করে বলা একটি নাম বলে প্রাচীন ব্যাখ্যায় আলোচনা রয়েছে।আবু কাবশা নামে একাধিক ব্যক্তি প্রাচীন আরব সমাজে ছিলেন। কোনো কোনো প্রাচীন বর্ণনায় এমন একজন আবু কাবশার কথা পাওয়া যায় যিনি কুরাইশদের প্রচলিত ধর্মের বাইরে গিয়ে নক্ষত্রের উপাসনা করতেন। তাই মুহাম্মদ প্রচলিত কুরাইশ ধর্মের বিরোধিতা করায় তাঁকে ‘আবু কাবশার ছেলে’ বলে বিদ্রূপ করা হতো—এমন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।তবে এই আবু কাবশার পরিচয় নিয়ে প্রাচীন সূত্রে মতভেদ আছে। তাই তাঁকে মুহাম্মদের আসল পূর্বপুরুষ বলা ঠিক নয়।‘বনু আসফার’ কথাটিও এখানে এসেছে। এটি কোনো ব্যক্তির নাম নয়। আরবি ঐতিহ্যে এটি রোমান বা বাইজেন্টাইনদের বোঝাতে ব্যবহৃত একটি নাম।খসরু বা পারস্যের সম্রাটের ঘটনাও এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী মুহাম্মদ পারস্যের সম্রাট খসরুর কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। খসরু চিঠিটি ছিঁড়ে ফেলেন। এরপর মুহাম্মদ তাঁর রাজ্য ছিন্নভিন্ন হওয়ার কথা বলেন। পরে খসরু নিহত হন এবং কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মুসলিম বাহিনী সাসানীয় সাম্রাজ্য দখল করে।এখানে প্রশ্ন হতে পারে—এটি কি মুহাম্মদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল ছিল?এই হাদিস থেকে এমন কথা প্রমাণ হয় না। খসরুর পতনের পেছনে পারস্য সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই, দীর্ঘ যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক দুর্বলতা ছিল। ইসলামী ঐতিহ্য অবশ্য এই ঘটনাকে মুহাম্মদের কথার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে।হিরাক্লিয়াসের ক্ষেত্রে একইভাবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। হাদিসের বর্ণনা একজন মুসলিম বর্ণনাকারীর মাধ্যমে এসেছে এবং এতে হিরাক্লিয়াসের মুহাম্মদের প্রতি গভীর আগ্রহ ও সম্মান দেখানো হয়েছে। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন—এমন সরাসরি ঘোষণা এখানে নেই।ইহুদিদের ব্যাপারে হিরাক্লিয়াসের নক্ষত্র দেখার ঘটনাটিও এই হাদিসে আছে। তিনি মনে করেছিলেন, খতনাকারী জাতির একজন নতুন রাজা বা নেতা আবির্ভূত হয়েছে। প্রথমে তাঁর লোকেরা ইহুদিদের কথা বলে। পরে আরবদের খতনা সম্পর্কে জানার পর তিনি বিষয়টি মুহাম্মদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।এই অংশে ইহুদিদের হত্যা করার কথা বলা হয়েছে। এটি হাদিসের বর্ণনার অংশ। তবে এখান থেকে সব খ্রিস্টান বা পুরো বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ইহুদিদের হত্যা করতে চাইত—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। এটি হিরাক্লিয়াসের ওই নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বক্তব্য হিসেবে দেখা উচিত।সবশেষে, এই হাদিস থেকে সরাসরি কয়েকটি বিষয় বোঝা যায়।মুহাম্মদের প্রচারের মূল কথা ছিল এক আল্লাহর উপাসনা করা এবং অন্য উপাস্যদের প্রত্যাখ্যান করা। তিনি আরবদের প্রচলিত মূর্তি ও বহু-দেবতার উপাসনার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি পূর্বপুরুষদের প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ত্যাগ করার কথা বলেছিলেন।আবু সুফিয়ান তখন মুহাম্মদের বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বংশ, চরিত্র, অনুসারীদের বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্বীকার করেছিলেন।হিরাক্লিয়াস সেই তথ্যগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে মুহাম্মদের নবুওয়াতের দাবিকে বিচার করেছিলেন। তাঁর কাছে মুহাম্মদের বংশ, চরিত্র, অনুসারীদের সংখ্যা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং চুক্তি রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।কিন্তু এই হাদিস থেকে বলা যায় না যে মুহাম্মদ সবাইকে জোর করে ইসলাম গ্রহণ করিয়েছিলেন। এটাও বলা যায় না যে তাঁর সব অনুসারী দরিদ্র বা নিচু শ্রেণির ছিল। আবার হিরাক্লিয়াস নিশ্চিতভাবে মুসলমান হয়েছিলেন—এমন কথাও এই হাদিস সরাসরি বলে না।সবচেয়ে সরলভাবে বললে, সহিহ বুখারির এই বর্ণনায় হিরাক্লিয়াস মুহাম্মদের দাবিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং তাঁর সত্যতার পক্ষে বেশ কিছু কারণ দেখেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কি না, এই হাদিস তা পরিষ্কার করে না।আর মুহাম্মদের সঙ্গে কুরাইশদের বিরোধের কারণ ছিল মূলত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক। মুহাম্মদ কুরাইশদের প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থা, বহু দেবতার উপাসনা এবং মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর নতুন সম্প্রদায় ধীরে ধীরে একটি আলাদা সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল। ফলে কুরাইশদের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ শুধু ধর্মের বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে ক্ষমতা, সমাজ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও যুক্ত হয়ে যায়।