“বাল” বা “বাআল” ছিলেন প্রাচীন কানানীয় ও ফিনিশীয় ধর্মীয় জগতের একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবতা। “বাআল” শব্দটির মূল অর্থ “প্রভু”, “অধিপতি” বা “কর্তা”। তাই প্রাচীন পশ্চিম সেমিটিক ভাষায় “বাআল” শব্দটি সব সময় একটি নির্দিষ্ট দেবতার ব্যক্তিনাম ছিল না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি সাধারণ অর্থে “প্রভু” বা “অধিপতি” বোঝাত এবং বিভিন্ন স্থানীয় দেবতার ক্ষেত্রেও এই উপাধি ব্যবহৃত হতে পারত। তবে বিশেষ ধর্মীয় প্রসঙ্গে বাল একটি শক্তিশালী দেবতার নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাচীন কানান, সিরিয়া ও ফিনিশিয়া অঞ্চলে তাঁর উপাসনা প্রচলিত ছিল। বালকে সাধারণত ঝড়, বজ্র, বৃষ্টি, মেঘ, কৃষি ও উর্বরতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তাঁর সঙ্গে হাদাদ দেবতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও দেখা যায়। বজ্রপাত, ঝড়, মেঘ এবং ষাঁড় তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ও চিত্রকল্প।বাল সম্পর্কে প্রাচীনতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসগুলোর একটি হলো উগারিতের বাল-চক্র। উগারিতীয় ভাষায় লেখা এই প্রাচীন কাহিনি ছয়টি মাটির ফলকে সংরক্ষিত—কে-টি-ইউ ১.১ থেকে কে-টি-ইউ ১.৬। এগুলো বাল-চক্রের মূল প্রাচীন পাঠের ভিত্তি। প্রচলিত বিন্যাসে ১.১–১.২-এ বাল ও ইয়ামের সংঘর্ষ, ১.৩–১.৪-এ বালের রাজপ্রাসাদ নির্মাণ এবং ১.৫–১.৬-এ বাল ও মৃত্যুর দেবতা মোটের সংঘর্ষ, বালের পতন, শোক, প্রত্যাবর্তন এবং পুনরায় রাজত্ব প্রতিষ্ঠার কাহিনি পাওয়া যায়। তবে প্রথম ফলক, অর্থাৎ কে-টি-ইউ ১.১-এর কিছু অংশ অত্যন্ত ভাঙা এবং তার স্তম্ভগুলোর ক্রম ও কিছু পুনর্গঠন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই ভাঙা অংশকে সরাসরি নিশ্চিত মূল পাঠ হিসেবে না দেখে পুনর্গঠিত পাঠ হিসেবে চিহ্নিত করা জরুরি।উগারিতীয় পাঠে বালের নাম 𐎁𐎓𐎍। এল বা ইল দেবতার নাম 𐎛𐎍; ইয়ামের নাম 𐎊𐎎; মোটের নাম 𐎎𐎚; অনাতের নাম 𐎓𐎐𐎚; আর কোথার দেবীয় কারিগর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ʿরপৎ-জাতীয় শব্দের অর্থ মেঘসমূহ এবং রকব-জাতীয় শব্দের অর্থ আরোহী বা আরোহণকারী। বালের সবচেয়ে বিখ্যাত উপাধিগুলোর একটি হলো “রকব ʿরপৎ”—অর্থাৎ “মেঘের আরোহী” বা “মেঘমালার আরোহী”। এই উপাধি বালের ঝড়, মেঘ ও বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বাল-চক্রের মূল কাহিনিতে বালকে শুরু থেকেই একমাত্র বা সর্বোচ্চ সৃষ্টিকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না। দেবসমাজে এলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চতর পিতৃসদৃশ কর্তৃত্ব দেখা যায়। বালের প্রধান কাহিনি হলো দেবীয় যোদ্ধা ও রাজা হিসেবে তাঁর উত্থান, রাজত্বের জন্য সংগ্রাম, প্রাসাদ নির্মাণ, ঝড় ও মেঘের শক্তির প্রকাশ, মোটের সঙ্গে সংঘর্ষ, মৃত্যু বা অদৃশ্যতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ইয়াম ও মোট, সহযোগীদের মধ্যে অনাত এবং দেবীয় কারিগর হিসেবে কোথার-ওয়া-হাসিস গুরুত্বপূর্ণ।চক্রের প্রথম বড় সংঘর্ষ বাল ও ইয়ামের মধ্যে। ইয়াম সমুদ্র বা জলীয় শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী দেবতা এবং দেবীয় রাজত্বের জন্য সংঘর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কে-টি-ইউ ১.১–১.২-এ এলের সভা, ইয়ামের কর্তৃত্বের দাবি, বালের অবস্থান এবং কোথার-ওয়া-হাসিসের তৈরি অস্ত্রের প্রসঙ্গ আসে। ইয়ামের পক্ষে বালকে দমন করার দাবি ওঠে এবং বাল সেই কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। কোথার-ওয়া-হাসিস বালের জন্য দেবীয় অস্ত্র প্রস্তুত করেন এবং বাল ইয়ামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ফলে বাল ইয়ামকে পরাজিত করেন। এই কারণে বালের রাজত্ব শুরু থেকেই কোনো স্বয়ংক্রিয় সর্বোচ্চত্ব নয়; দেবীয় সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজকীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। “জবুল ইয়াম” ধরনের একটি অভিব্যক্তির সঙ্গে “জবুল” শব্দের অর্থ রাজপুত্র বা অধিপতি এবং “ইয়াম” হলো ইয়াম; এর কাছাকাছি অর্থ “ইয়ামের রাজপুত্র বা অধিপতি”। এই ধরনের অভিব্যক্তি দেবীয় স্তরবিন্যাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।কে-টি-ইউ ১.২-এর বাল–ইয়াম যুদ্ধ-পর্বে বালের দেবীয় অস্ত্র এবং যুদ্ধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি ক্ষতিগ্রস্ত পাঠাংশ হলো—[y]d bʿl b[y]d ymএখানে “ইয়াদ” অর্থ হাত, “বাল” বাল এবং “ইয়াম” ইয়াম। কিন্তু ফলক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সম্পূর্ণ বাক্য নিশ্চিতভাবে পুনর্গঠন করা যায় না। একইভাবে “ইমহৎস” শব্দটি আঘাত করা, চূর্ণ করা বা আঘাতে পরাস্ত করার অর্থবাহী মূলের সঙ্গে যুক্ত; প্রসঙ্গ অনুসারে এর অর্থ “সে আঘাত করবে” অথবা “আঘাতে চূর্ণ করবে” হতে পারে। তাই এখানে ক্রিয়ার কর্তা ও সঠিক অর্থ নির্ধারণে বাক্যের প্রসঙ্গ বিবেচনা করা প্রয়োজন।ইয়ামকে পরাজিত করার পর বাল নিজের জন্য একটি রাজপ্রাসাদ চান। কে-টি-ইউ ১.৩–১.৪-এ এই প্রাসাদ নির্মাণের দীর্ঘ বিবরণ রয়েছে। “বৎ বাল” বা “বেত বালি”-জাতীয় অভিব্যক্তির অর্থ “বালের গৃহ”। এটি সাধারণ বাড়ি নয়; কাহিনিতে এটি বালের রাজকীয় দেবীয় আবাস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের দৃশ্যমান প্রতীক। এই নির্মাণে কোথার-ওয়া-হাসিস গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি দেবতাদের কারিগর ও নির্মাতা। কে-টি-ইউ ১.৩-এ অনাতের যুদ্ধপর্ব, বালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং বালের প্রাসাদ পাওয়ার প্রচেষ্টা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।অনাত ছিলেন বালের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ও যোদ্ধা দেবী। তাঁর একটি পরিচিত অভিব্যক্তি হলো “অনাত, শক্তিশালী কুমারী”। কে-টি-ইউ ১.৩–১.৪-এ অনাতের যুদ্ধের বিবরণে অত্যন্ত তীব্র ও সহিংস চিত্রকল্প রয়েছে, যা বালের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কাহিনির অংশ।কে-টি-ইউ ১.৪ বাল-চক্রের অন্যতম ভালোভাবে সংরক্ষিত ফলক এবং এতে আটটি স্তম্ভ রয়েছে। এখানে বালের প্রাসাদ নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়া এবং তার উদ্বোধনের বিবরণ পাওয়া যায়। প্রাসাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বালের জানালা। “ইয়াফতাহ হুলান” ধরনের পাঠে “ইয়াফতাহ” শব্দের মূল অর্থ খোলা এবং “হুলান” অর্থ জানালা। তাই আক্ষরিক অর্থ “জানালা খোলে” বা “জানালা খুলবে”; প্রসঙ্গগতভাবে এটি “সে একটি জানালা খুলল” হিসেবে অনুবাদ করা হয়।জানালা খোলার পর বালের ঝড়ের চিত্রকল্প প্রকাশিত হয়। “মেঘের আরোহী” উপাধির সঙ্গে মেঘের চিত্রকল্প যুক্ত হয়। বালের কণ্ঠ বা ধ্বনির জন্য “কোল” শব্দ ব্যবহৃত হয়। এই শব্দের মূল অর্থ “কণ্ঠ”, “শব্দ” বা “আওয়াজ”; তাই প্রাথমিক পাঠের আক্ষরিক অনুবাদে “বালের কণ্ঠ” বা “বালের ধ্বনি” বলা বেশি সঠিক। তবে প্রসঙ্গগতভাবে এটি বজ্রধ্বনি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। “কোল বাল” অর্থ আক্ষরিকভাবে “বালের কণ্ঠ বা ধ্বনি”। মেঘ বোঝানো শব্দের সঙ্গে এটি যুক্ত হয়ে বালের ঝড়দেবতা-সদৃশ চরিত্রকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে। অর্থাৎ প্রাসাদ, জানালা, মেঘ এবং বালের কণ্ঠ বা ধ্বনি—এই ধারাবাহিক চিত্রকল্পে তাঁর ঝড় ও বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক ফুটে ওঠে।বাল-চক্রের পরবর্তী বড় সংঘর্ষ বাল ও মোটের মধ্যে। মোটের নাম “মত” এবং এর সঙ্গে মৃত্যুর অর্থবাহী সেমিটিক মূলের সম্পর্ক রয়েছে। চক্রে মোট শুধু বিমূর্ত মৃত্যু নয়; ব্যক্তিরূপে তিনি একজন দেবতা। কে-টি-ইউ ১.৫–১.৬-এ মোট বালের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রবেশ করেন এবং বালের মৃত্যু বা অদৃশ্যতার কাহিনি শুরু হয়। “দেবতাদের সন্তান” অর্থবাহী অভিব্যক্তিও এই অংশে দেখা যায়। বাল মোটের মুখোমুখি হন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ঘটে। বালের অনুপস্থিতিতে দেবসমাজে সংকট সৃষ্টি হয়।কে-টি-ইউ ১.৬-এ বালের মৃত্যু, শোক এবং প্রত্যাবর্তনের কাহিনি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাল মৃত বা অদৃশ্য বলে গণ্য হন। এল শোক করেন এবং অনাতও বালের জন্য শোক করেন। বালের দেহ উদ্ধার ও সমাধিস্থ করার কাহিনি আসে। অথতার বালের স্থানে সিংহাসনে বসেন। পরে এল স্বপ্নের মাধ্যমে বালের প্রত্যাবর্তনের সংবাদ পান। বাল আবার ফিরে আসেন এবং মোটের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধ করেন। শেষে বাল তাঁর রাজত্ব পুনরুদ্ধার করেন।“মত আলিয়ান বাল” ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠাংশের প্রসঙ্গগত অর্থ হলো “শক্তিমান বাল মৃত”। আবার এলের স্বপ্ন-সম্পর্কিত সংরক্ষিত অংশে—hm mt aliyn bʿl
whm ḫlq zbl bʿl arṣএই ধরনের পাঠ পাওয়া যায়। এর সারার্থের কাছাকাছি অর্থ হলো, “যদি শক্তিমান বাল মৃত হয় এবং পৃথিবীর অধিপতি বাল বিনষ্ট হয়ে থাকে...”। এখানে পাঠের কিছু অংশ ভাঙা বা পুনর্গঠিত হওয়ায় নিশ্চিত পাঠ এবং সম্পাদকের পুনর্গঠন আলাদা করে দেখা জরুরি।কে-টি-ইউ ১.৬-এর শেষের দিকে বাল ও মোটের চূড়ান্ত যুদ্ধের অসাধারণ সমান্তরাল চিত্রকল্প রয়েছে। “ক” শব্দটি এখানে “যেমন” বা “মতো” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যুদ্ধের বিভিন্ন অংশে দুই দেবতার প্রচণ্ড সংঘর্ষকে বিভিন্ন উপমায় প্রকাশ করা হয়। “ক গমরম”, “ক রʿমম” এবং “ক বতনম”-জাতীয় পাঠ পাওয়া যায়, যদিও কিছু শব্দের সঠিক অর্থ নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। একটি অংশে তাদের একে অপরের সঙ্গে প্রচণ্ডভাবে লড়াই করার কথা বলা হয়েছে; আরেকটি অংশে তাদের সংঘর্ষকে বন্য ষাঁড়ের মতো আঘাত করার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে; অন্য অংশে সাপের মতো একে অপরকে কামড়ানোর চিত্রকল্প রয়েছে। শেষে তারা একে অপরকে মাটিতে ফেলে দেয়—মোট পড়ে, বালও পড়ে। এই সমান্তরাল যুদ্ধ-স্তবক কে-টি-ইউ ১.৬, ষষ্ঠ স্তম্ভের ১৬খ–২২ক অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। যুদ্ধের ফল হিসেবে মোট পরাজিত হন এবং বালের রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।বাল-চক্রের শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখক-সংক্রান্ত বিবরণ বা লিপিকার-সমাপ্তি আছে। কে-টি-ইউ ১.৬-এর এই অংশে ইলিমিলকু নামের লেখক এবং নিকমাদ নামের উগারিতের রাজাকে উল্লেখ করা হয়েছে। সংরক্ষিত পাঠের একটি অংশ হলো—spr ilmlk šbny
lmd atn prln rb
khnm rb nqdm
... nqmd mlk ugrtএর সারার্থ হলো লেখক ইলিমিলকু, তাঁর শিক্ষার সঙ্গে আতানু বা আত্তেনুর সম্পর্ক এবং নিকমাদ, উগারিতের রাজা—এই লেখক ও রাজকীয় পরিবেশের উল্লেখ। এটি বাল-চক্রের ধর্মীয় কাহিনির পাশাপাশি ফলকটির লেখক ও রাজকীয় পরিবেশ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক-পাঠের সাক্ষ্য।অন্যদিকে হিব্রু বাইবেলে বালের পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থানে দেখা যায়। এখানে বালকে ইস্রায়েলের যিহোবা-উপাসনার প্রতিদ্বন্দ্বী দেবতা হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং বাল-উপাসনাকে বারবার নিন্দা করা হয়েছে। বিচারকর্তৃগণ ২:১১–১৩-এ বলা হয়, ইস্রায়েলের সন্তানরা যিহোবার দৃষ্টিতে মন্দ কাজ করে “বালদের” সেবা করেছিল। ২:১১-এর হিব্রু পাঠ হলো—וַיַּעֲשׂוּ בְנֵי־יִשְׂרָאֵל אֶת־הָרַע בְּעֵינֵי יְהוָה וַיַּעַבְדוּ אֶת־הַבְּעָלִים׃এর অর্থ, “ইস্রায়েলের সন্তানরা যিহোবার দৃষ্টিতে যা মন্দ তা করল এবং বালদের সেবা করল।” ২:১২-এ বলা হয়, তারা তাদের পিতৃপুরুষদের ঈশ্বর যিহোবাকে ত্যাগ করে চারপাশের জাতিগুলোর অন্যান্য দেবতার অনুসরণ ও উপাসনা করেছিল। ২:১৩-এ সরাসরি বলা হয়েছে, “তারা যিহোবাকে ত্যাগ করল এবং বালের ও আশ্তারোতের সেবা করল।” এই অংশে বালকে যিহোবার বিকল্প ধর্মীয় উপাসনার কেন্দ্র হিসেবে দেখানো হয়েছে।আহাবের রাজত্বে বাল-উপাসনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজাবলি প্রথম ১৬:৩০–৩৩-এ আহাবের কর্মকাণ্ডের বিবরণ আছে। ১৬:৩১-এ বলা হয়, আহাব সীদোনীয় রাজা এতবালের কন্যা ঈষেবলকে বিবাহ করেন এবং “গিয়ে বালের সেবা করলেন ও তার কাছে প্রণত হলেন।” ১৬:৩২-এ বলা হয়, তিনি শমরোণে বালের জন্য একটি বেদী স্থাপন করেন এবং বালের গৃহ নির্মাণ করেন। ১৬:৩৩-এ আহাব আশেরাহ নির্মাণ করেন এবং যিহোবাকে ক্রুদ্ধ করার মতো আরও কাজ করেন। অর্থাৎ বাইবেলীয় কাহিনিতে বালের সঙ্গে মন্দির, বেদী, উপাসনা এবং আশেরাহ-সংক্রান্ত ধর্মীয় পরিবেশের সম্পর্ক দেখা যায়।বাল-বিরোধী বাইবেলীয় কাহিনির সবচেয়ে বিখ্যাত অংশগুলোর একটি হলো রাজাবলি প্রথম ১৮-এর কর্মিল পর্ব। ১৮:২১-এ ইলিয়াহ জনগণকে বলেন, “তোমরা আর কতকাল দুই মতের মধ্যে খোঁড়াতে থাকবে? যিহোবা যদি ঈশ্বর হন, তবে তাঁর অনুসরণ কর; আর যদি বাল হয়, তবে তার অনুসরণ কর।” এখানে যিহোবা ও বালকে সরাসরি ধর্মীয় বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৮:২৪-এ ইলিয়াহ বলেন, “তোমরা তোমাদের দেবতার নামে ডাকবে, আর আমি যিহোবার নামে ডাকব; যে দেবতা আগুন দিয়ে উত্তর দেবেন, তিনিই ঈশ্বর।” এরপর বালের নবীরা বালের নামে আহ্বান করতে থাকে। ১৮:২৬-এ তারা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত “হে বাল, আমাদের উত্তর দাও” বলে ডাকতে থাকে। ১৮:২৭-এ ইলিয়াহ তাদের নিয়ে বিদ্রূপ করে উচ্চস্বরে ডাকতে বলেন, কারণ “সে তো দেবতা।” এরপর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিবরণ আসে।বিপরীতে ১৮:৩৬-এ ইলিয়াহ যিহোবাকে অব্রাহাম, ইসহাক ও ইস্রায়েলের ঈশ্বর হিসেবে আহ্বান করেন। ১৮:৩৮-এ যিহোবার আগুন নেমে এসে হোমবলি, কাঠ, পাথর, ধূলি ও জল গ্রাস করে। ১৮:৩৯-এ জনগণ উপুড় হয়ে বলে, “যিহোবাই ঈশ্বর, যিহোবাই ঈশ্বর।” ফলে এই কাহিনিতে যিহোবার শ্রেষ্ঠত্ব এবং বাল-উপাসনার ব্যর্থতা দেখানো হয়েছে।রাজাবলি প্রথম ১৯:১৮-এ বালের সামনে উপাসনার ধরন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। সেখানে যিহোবা বলেন যে ইস্রায়েলে সাত হাজার মানুষ রাখা হয়েছে—“যে সমস্ত হাঁটু বালের কাছে নত হয়নি এবং যে সমস্ত মুখ তাকে চুম্বন করেনি।” অর্থাৎ বালের প্রতি ভক্তির আচরণ হিসেবে হাঁটু নত করা এবং চুম্বনের উল্লেখ রয়েছে।রাজাবলি দ্বিতীয় ১০ অধ্যায়ে যেহূ বাল-উপাসনা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন। ১০:১৮-এ তিনি বলেন, “আহাব বালকে অল্প সেবা করেছে; যেহূ তাকে অনেক সেবা করবে।” কিন্তু এটি প্রকৃত উপাসনার ঘোষণা নয়; বালের সমস্ত উপাসককে একত্র করার জন্য একটি প্রতারণামূলক পরিকল্পনা। ১০:১৯-এ বালের সমস্ত নবী, উপাসক ও পুরোহিতকে ডাকার নির্দেশ দেওয়া হয়, কারণ বালের জন্য একটি “মহা বলি” হবে। পরে সবাই একত্র হলে যেহূ বাল-উপাসনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। ১০:২৭-এ বালের স্তম্ভ এবং বালের গৃহ ধ্বংস করা হয় এবং সেই স্থানকে অপবিত্র স্থানে পরিণত করা হয়। ১০:২৮-এ বলা হয়, “এইভাবে যেহূ ইস্রায়েল থেকে বালকে নির্মূল করল।” ফলে এই অংশে বালের মন্দির, স্তম্ভ, পুরোহিত, নবী, উপাসক এবং উপাসনাপদ্ধতি সম্পর্কে বাইবেলীয় কাহিনির অন্যতম স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়।হোশেয় গ্রন্থে বাল শব্দের একটি বিশেষ ভাষাগত ব্যবহার দেখা যায়। হোশেয় ২:১৬-এ যিহোবা বলেন, “সেই দিনে—যিহোবার ঘোষণা—তুমি আমাকে ‘আমার স্বামী’ বলবে; আর আমাকে আর ‘আমার বাল’ বলবে না।” এখানে “বালি” শব্দটির অর্থ “আমার বাল”, “আমার প্রভু” অথবা প্রসঙ্গ অনুযায়ী “আমার স্বামী” হতে পারে। কারণ “বাল” শব্দের সাধারণ অর্থ প্রভু বা অধিপতি এবং স্বামীও হতে পারে। ২:১৭-এ বলা হয়, “আমি তার মুখ থেকে বালদের নাম সরিয়ে দেব; তাদের নাম আর স্মরণ করা হবে না।” অর্থাৎ এখানে বাল শব্দের সাধারণ “স্বামী/প্রভু” অর্থ এবং বাল দেবতার নাম—এই দুই অর্থের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ-খেলা রয়েছে।যিরমিয়াতেও বাল-উপাসনার বিরুদ্ধে একাধিক বক্তব্য রয়েছে। যিরমিয়া ২:৮-এ বলা হয়, নবীরা বালের নামে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে এবং যা উপকার করে না তার অনুসরণ করেছে। যিরমিয়া ৭:৯-এ চুরি, হত্যা, ব্যভিচার, মিথ্যা শপথের সঙ্গে বালের উদ্দেশে ধূপ জ্বালানো এবং অন্য দেবতাদের অনুসরণের কথা একসঙ্গে বলা হয়েছে। যিরমিয়া ২৩:২৭-এ বলা হয়, লোকেরা তাদের স্বপ্নের মাধ্যমে যিহোবার নাম ভুলিয়ে দিতে চায়, যেমন তাদের পূর্বপুরুষেরা বালের কারণে যিহোবার নাম ভুলেছিল। হোশেয় ১৩:১-এও ইফ্রয়িমের বালের মাধ্যমে অপরাধ করার কথা বলা হয়েছে।বাল-সম্পর্কিত আরও গুরুত্বপূর্ণ বাইবেলীয় অংশের মধ্যে বিচারকর্তৃগণ ৩:৭, ৬:২৫–৩২, ৮:৩৩ এবং ১০:৬; রাজাবলি প্রথম ১৬:৩০–৩৩, ১৮:১৮–৪০, ১৯:১৮ এবং ২২:৫৩–৫৪; রাজাবলি দ্বিতীয় ১০:১৮–২৮, ১১:১৮, ১৭:১৬, ২১:৩ এবং ২৩:৪–৫; যিরমিয়া ২:৮, ৭:৯, ৯:১৩–১৪, ১১:১৩, ১৯:৫, ২৩:১৩ ও ২৩:২৭, ৩২:২৯ ও ৩২:৩৫; এবং হোশেয় ২:৮, ২:১৩–১৭, ৯:১০, ১১:২ ও ১৩:১ উল্লেখযোগ্য। এই তালিকায় বাল বা বালিমের সরাসরি উল্লেখ এবং বাল-উপাসনার গুরুত্বপূর্ণ কাহিনি—দুটিই অন্তর্ভুক্ত।প্রাচীন উগারিতীয় বাল-চক্র এবং হিব্রু বাইবেল পাশাপাশি রাখলে দুই প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থসমষ্টিতে বালের দুটি ভিন্ন চিত্র স্পষ্ট হয়। উগারিতীয় বাল-চক্রে বাল একজন দেবীয় যোদ্ধা ও রাজা। তিনি ইয়ামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, নিজের প্রাসাদ নির্মাণ করেন, “মেঘের আরোহী” হিসেবে ঝড় ও মেঘের শক্তির চিত্র বহন করেন, মোটের সঙ্গে সংঘর্ষে পতিত হন, পরে ফিরে আসেন এবং রাজত্ব পুনরুদ্ধার করেন। অন্যদিকে হিব্রু বাইবেলে বাল হলেন যিহোবা-উপাসনার প্রতিদ্বন্দ্বী দেবতা, যার কাছে বলি, ধূপ, প্রার্থনা ও উপাসনা করা হয় এবং যার নবী, পুরোহিত, মন্দির ও উপাসনাব্যবস্থা ছিল বলে বাইবেলীয় কাহিনি বর্ণনা করে। কর্মিলে ইলিয়াহর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পরবর্তী নবীদের নিন্দা বাল-উপাসনার বিরুদ্ধে বাইবেলীয় অবস্থানকে স্পষ্ট করে।এই দুই প্রাচীন উৎসের তুলনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উগারিতীয় বাল-চক্রকে সরলভাবে “বালই সর্বোচ্চ সৃষ্টিকর্তা দেবতা”—এভাবে বলা ঠিক নয়। প্রাচীন চক্রে বালের প্রধান পরিচয় দেবীয় রাজা, যোদ্ধা এবং ঝড়ের দেবতা হিসেবে। এল দেবসমাজে একটি উচ্চতর ও পিতৃসদৃশ অবস্থান রাখেন। বাল নিজের রাজত্ব সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বিখ্যাত উপাধি “মেঘের আরোহী”; তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ বা ধ্বনি, মেঘ, গৃহ, জানালা, সমুদ্র, মৃত্যু, অনাত এবং কোথারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ধারণা যুক্ত। তাঁর বৃহৎ কাহিনি হলো ইয়ামের বিরুদ্ধে বিজয়, রাজপ্রাসাদ নির্মাণ, ঝড় ও মেঘের প্রকাশ, মোটের সঙ্গে সংঘর্ষ, মৃত্যু বা অদৃশ্যতা, শোক, প্রত্যাবর্তন এবং রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আর হিব্রু বাইবেলে তাঁর প্রধান পরিচয় হলো যিহোবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাল-উপাসনার দেবতা। তাই বালের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পরিচয় বোঝার জন্য উগারিতীয় প্রাথমিক পাঠ এবং হিব্রু বাইবেলের প্রাচীন হিব্রু পাঠ—এই দুই উৎসকে আলাদা রেখে পাশাপাশি পড়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।