নর্স দেবী লীন

লীনলীন বা Hlín নর্স পুরাণের একজন নারী দেবী। তিনি প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। নর্স পুরাণ মূলত বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ডের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ছিল। তাই লীনকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের দেবী বলা ঠিক নয়। তাঁকে মূলত নর্স বা স্ক্যান্ডিনেভীয় পুরাণের দেবী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়।লীনকে সাধারণত একজন রক্ষাকর্ত্রী দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব মানুষ বিপদের মধ্যে পড়েছে এবং যাদের রক্ষা করতে দেবী ফ্রিগ ইচ্ছুক, তাদের নিরাপদ রাখার দায়িত্ব লীনের ওপর দেওয়া হয়েছে বলে নর্স পুরাণের কিছু গ্রন্থে বলা হয়েছে।লীন সম্পর্কে আমাদের প্রধান তথ্য পাওয়া যায় এড্ডা কাব্য, স্নোরি স্টার্লুসনের লেখা প্রোস এড্ডা এবং বিভিন্ন স্কালদিক কবিতা থেকে। তবে লীনকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—তিনি কি সত্যিই ফ্রিগের থেকে আলাদা একজন দেবী, নাকি লীন আসলে দেবী ফ্রিগেরই একটি নাম বা উপাধি? এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে সম্পূর্ণ ঐকমত্য নেই।লীরনের উল্লেখ পাওয়া যায় এড্ডা কাব্যের বিখ্যাত কবিতা ‘ভোলুস্পা’ (Völuspá)-তে। এই কবিতায় র‍্যাগনারক বা দেবতাদের মহাবিপর্যয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, লীনের দ্বিতীয় দুঃখ তখন পূর্ণ হবে, যখন ওডিন একটি নেকড়ের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হবেন এবং দেবতাদের জন্য মহাবিপর্যয় নেমে আসবে।এই ‘দ্বিতীয় দুঃখ’-এর কথাটিই লীনের পরিচয় নিয়ে বিতর্কের অন্যতম কারণ। অনেক গবেষক মনে করেন, এখানে লীন আসলে ফ্রিগেরই অন্য নাম। কারণ ফ্রিগের প্রথম বড় দুঃখ ছিল তাঁর পুত্র বালদ্রের মৃত্যু। আর তাঁর দ্বিতীয় দুঃখ হতে পারে স্বামী ওডিনের মৃত্যু। সেই হিসেবে ‘লীনের দ্বিতীয় দুঃখ’কে ফ্রিগের দ্বিতীয় দুঃখ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়।স্নোরি স্টার্লুসনের প্রোস এড্ডা-তেও লীনের উল্লেখ রয়েছে। ‘গিলফাজিনিং’ অংশে তাঁকে কয়েকজন নারী দেবতার মধ্যে একজন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যেসব মানুষকে ফ্রিগ বিপদ থেকে রক্ষা করতে চান, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব লীনের ওপর রয়েছে। অর্থাৎ লীনের প্রধান ভূমিকা হলো বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করা এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া।প্রোস এড্ডার পরবর্তী অংশেও আবার লীনের কথা এসেছে। সেখানে র‍্যাগনারকের সময় ওডিনের মৃত্যুর সঙ্গে লীনের ‘দ্বিতীয় দুঃখ’-এর সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। এছাড়া স্কালদাস্কাপারমাল-এ লীনের নাম অন্যান্য নারী দেবতার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।স্কালদিক কবিতাতেও লীনের নাম পাওয়া যায়। কবিরা অনেক সময় নারীদের বোঝাতে বিভিন্ন রূপক বা কেনিং ব্যবহার করতেন। সেই ধরনের কয়েকটি কাব্যিক রূপকে লীনের নাম ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে বোঝা যায় যে লীন নামটি প্রাচীন নর্স কবিতার জগতে পরিচিত ছিল।দশম শতকের কবি কর্মার ওগ্মুন্ডারসন-এর কবিতাতেও লীনের নাম পাওয়া যায়। পরবর্তী আরও কিছু স্কালদিক কবিতায় একইভাবে তাঁর নাম ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এসব কবিতায় লীনকে সবসময় স্বাধীন একজন দেবী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর নাম কেবল একটি কাব্যিক উপাধি বা রূপক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।লীনের পরিচয় নিয়ে আরও কিছু অনিশ্চয়তা একটি আইসল্যান্ডীয় সাগা Hávarðar saga Ísfirðings-এর একটি অংশে দেখা যায়। সেখানে লীনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বাক্য পাওয়া যায়। কিন্তু সেই বাক্যের সঠিক পাঠ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, পরে লেখক বা সম্পাদকরা সেখানে পরিবর্তন করেছেন। তাই এই অংশ থেকে লীনের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।আধুনিক নর্স পুরাণের গবেষকদের মধ্যেও লীনকে নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।গবেষক অ্যান্ডি অর্চার্ড মনে করেন, ‘ভোলুস্পা’-য় লীন সম্ভবত ফ্রিগেরই একটি অন্য নাম। তাঁর মতে, প্রাচীন নর্স সাহিত্যে লীন নামটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা দেখলে মনে হয়, তাঁকে সবসময় ফ্রিগের থেকে আলাদা একজন দেবী হিসেবে দেখা যায় না।গবেষক রুদলফ সিমেক-ও কাছাকাছি একটি মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, স্নোরি সম্ভবত লীনকে ফ্রিগের থেকে আলাদা একজন দেবী হিসেবে বুঝেছিলেন। কিন্তু প্রাচীন কাব্যিক ঐতিহ্যে লীন হয়তো ফ্রিগেরই একটি নাম বা উপাধি ছিল। ফলে স্নোরির লেখায় লীন একজন স্বতন্ত্র দেবীর রূপ পেয়ে থাকতে পারেন।তবে সিমেকের আলোচনায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। নর্স পুরাণে সাগা, লীন, সন, সত্রা, ভার ও ভর-এর মতো কয়েকজন নারী দেবী বা দেবীসদৃশ চরিত্রের কথা বলা হয়েছে, যাদের সঙ্গে রক্ষা করার ধারণা যুক্ত। তাদের প্রত্যেকের রক্ষার ক্ষেত্র কিছুটা আলাদা বলে মনে করা হয়েছে। সেই দিক থেকে লীনকে একজন স্বতন্ত্র রক্ষাকর্ত্রী হিসেবেও দেখা সম্ভব।গবেষক জন লিনডোর লীনকে ফ্রিগের সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে করেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘ভোলুস্পা’-য় লীনের দ্বিতীয় দুঃখ আসলে ফ্রিগের দ্বিতীয় দুঃখ। প্রথম দুঃখ ছিল বালদ্রের মৃত্যু এবং দ্বিতীয় দুঃখ ছিল ওডিনের মৃত্যু। এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে লীন ও ফ্রিগের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।সুতরাং লীনকে নিয়ে দুটি প্রধান ধারণা পাওয়া যায়। প্রথম ধারণা অনুযায়ী, লীন একজন স্বতন্ত্র রক্ষাকর্ত্রী দেবী, যাঁর কাজ বিপদের সময় মানুষকে রক্ষা করা। দ্বিতীয় ধারণা অনুযায়ী, লীন আসলে ফ্রিগেরই একটি নাম, উপাধি বা বিশেষ রূপ।নর্স পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি ও গ্রন্থ একই সময়ে রচিত হয়নি এবং এগুলোর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। ফলে লীনের মতো কিছু দেবতার পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। তবে প্রাচীন নর্স সাহিত্যে লীনের সঙ্গে রক্ষা, আশ্রয় এবং বিপদ থেকে নিরাপদে সরে যাওয়ার ধারণা স্পষ্টভাবে যুক্ত।সব মিলিয়ে বলা যায়, লীন নর্স পুরাণের একজন রক্ষাকর্ত্রী দেবী বা দেবীসদৃশ চরিত্র। তিনি ফ্রিগের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। কিছু গবেষকের মতে তিনি ফ্রিগেরই অন্য নাম, আবার অন্য ব্যাখ্যায় তিনি ফ্রিগের অধীনে কাজ করা পৃথক একজন রক্ষাকর্ত্রী দেবী। তাই লীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর রক্ষাকারী ভূমিকা, আর তাঁর প্রকৃত পরিচয়—স্বতন্ত্র দেবী নাকি ফ্রিগের অন্য রূপ—এখনও গবেষণার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *