ফ্রেজা বা ফ্রাইযা নর্স বা নর্দীয় পুরাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেবী। তিনি মূলত প্রেম, বিবাহ, যৌনতা ও উর্বরতার সঙ্গে যুক্ত। তবে তার পরিচয় শুধু প্রেম বা সৌন্দর্যের দেবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বর্ণ, প্রকৃতি, জ্ঞান, জাদুবিদ্যা, যুদ্ধ ও মৃত্যুর সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নর্স দেবতাদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আধুনিক যুগের লেখালেখি ও চিত্রকলায় ফ্রেজাকে ফ্রিগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। আবার রোমান পুরাণের প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ভেনাসের সঙ্গেও ফ্রেজার কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।প্রচলিত চিত্রে ফ্রেজাকে সাধারণত দুটি বিড়াল-টানা রথে চড়ে থাকতে দেখা যায়। ১৮৫২ সালে নিলস ব্লোমের একটি চিত্রে তাকে এইভাবে দেখানো হয়েছে। ১৯০৫ সালে শিল্পী জন বাউয়ারও ফ্রেজার একটি উল্লেখযোগ্য ছবি আঁকেন।প্রাচীন নর্স পুরাণ অনুযায়ী ফ্রেজার স্বামীর নাম ওদ্র। তার দুটি কন্যার নাম নস ও গেরসিমি। তার পিতা ছিলেন সমুদ্রের দেবতা নিওর্দ্র এবং তার ভাই ছিলেন ফ্রাইর। ফ্রেজার মায়ের পরিচয় স্পষ্ট নয়। একটি প্রাচীন ঐতিহ্যে তাকে নিওর্দ্রের বোন বলা হয়েছে, কিন্তু তার নাম জানা যায় না। ফ্রেজা ও তার পরিবারের সদস্যরা ভনির দেবতাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ভনির দেবতারা মূলত উর্বরতা, প্রকৃতি, সমৃদ্ধি, জ্ঞান ও জাদুবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।ফ্রেজার সঙ্গে বাজপাখির পালক দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ পোশাকেরও সম্পর্ক ছিল। এই পোশাক পরে তিনি উড়ে যেতে পারতেন বলে পুরাণে উল্লেখ রয়েছে। তার একটি বিখ্যাত অলংকার ছিল ব্রিসিঙ্গামেন নামের হার। ফ্রেজা বহু নামে পরিচিত ছিলেন। গেফ্ন্, হ্যোর্ন, মারড্যোল, স্যির, ভালফ্রাইয়া এবং ভানাডিস তার অন্যান্য নাম বা উপাধির মধ্যে পড়ে।‘ফ্রেজা’ নামটির অর্থ মূলত ‘লেডি’ বা ‘সম্মানীয় নারী’। শব্দটির উৎস প্রাচীন জার্মানিক ভাষার একটি শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। প্রাচীন উচ্চ জার্মান ভাষায় এর কাছাকাছি শব্দ ছিল ‘ফ্রাউয়া’। আধুনিক জার্মান ভাষার ‘ফ্রাউ’ শব্দটিরও একই উৎস বলে মনে করা হয়। গবেষকদের একাংশের মতে, ‘ফ্রেজা’ প্রথমদিকে দেবীর প্রকৃত নাম ছিল না; এটি ছিল একজন সম্মানীয় নারীর জন্য ব্যবহৃত উপাধি। পরে এই উপাধিই এত বেশি প্রচলিত হয়ে যায় যে তা দেবীর নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আগের বা প্রকৃত নাম কী ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।ফ্রেজার নামের এই ইতিহাসের কারণে কিছু গবেষক মনে করেন, ফ্রেজা ও ফ্রিগ সম্ভবত একসময় একই ধরনের কোনো প্রাচীন দেবত্বের দুটি রূপ ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বৈশিষ্ট্য আলাদা হয়ে দুটি পৃথক দেবীর ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে এটি একটি গবেষণামূলক মত, সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নয়।ফ্রেজা সম্পর্কে আমাদের প্রধান তথ্য পাওয়া যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লিখিত বা সংকলিত নর্স সাহিত্য থেকে। এর মধ্যে ইডিক কবিতাগুচ্ছ, স্নোরি স্টুরলসনের ‘স্নোর-এডা’ এবং ‘হাইমসক্রিংলা’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও বিভিন্ন আইসল্যান্ডীয় কাহিনি, স্কাল্ড কবিতা এবং ‘স্যোরলা দাত্র’ নামের কাহিনিতেও তার উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ের স্ক্যান্ডিনেভীয় লোককথাতেও ফ্রেজার স্মৃতি টিকে আছে।ইডিক কবিতাগুচ্ছের বিভিন্ন কবিতায় ফ্রেজার উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘ভোলুস্পা’, ‘গ্রিমনিস্মাল’, ‘লোকাসেনা’, ‘দ্রিমস্কভিদা’, ‘ওড্রুনারগ্রাট্র’ এবং ‘হিন্ডলুলিয়ো’ প্রভৃতি কবিতায় তার উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে ‘লোকাসেনা’, ‘দ্রিমস্কভিদা’ ও ‘হিন্ডলুলিয়ো’ তার চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।‘লোকাসেনা’ কবিতায় ফ্রেজা ও দেবতা লোকির মধ্যে কথোপকথন ও তর্কের ঘটনা রয়েছে। এখানে ফ্রেজাকে একজন শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী দেবী হিসেবে দেখা যায়। ‘দ্রিমস্কভিদা’ কবিতায় দেবতা থরের বিখ্যাত হাতুড়ি মিয়োলনির হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সেই হাতুড়ি উদ্ধারের ঘটনায় ফ্রেজার সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর ‘হিন্ডলুলিয়ো’ কবিতায় ফ্রেজা প্রধান চরিত্রের ভূমিকায় রয়েছেন। সেখানে তিনি তার অনুগামী ওতারকে তার বংশপরিচয় জানতে সাহায্য করেন।স্নোরি স্টুরলসনের ‘স্নোর-এডা’-তেও ফ্রেজার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে ‘গিলফাগিনিং’ ও ‘স্কাল্ডস্কাপারমাল’ অংশে তার পরিচয় ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ফ্রেজা ও তার ভাই ফ্রাইর নিওর্দ্রের সন্তান। ফ্রেজার আবাসস্থলের নাম ফোল্কভাংর্। সেখানে তার বিশাল প্রাসাদ সেস্রুমনির অবস্থিত।ফ্রেজার সঙ্গে যুদ্ধ ও মৃত্যুরও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত যোদ্ধাদের একটি অংশ ওডিনের কাছে যায়, আর অন্য একটি অংশ ফ্রেজার অধীনে ফোল্কভাংর্-এ অবস্থান করে। এই কারণে ফ্রেজাকে শুধু প্রেম, সৌন্দর্য ও উর্বরতার দেবী হিসেবে দেখলে তার সম্পূর্ণ চরিত্র বোঝা যায় না। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বীরদের সঙ্গে তার সম্পর্ক তাকে মৃত্যু ও যুদ্ধের সঙ্গেও যুক্ত করে।ফ্রেজার স্বামী ওদ্র প্রায়ই দীর্ঘ সময়ের জন্য তার কাছ থেকে দূরে চলে যেতেন। তার অনুপস্থিতিতে ফ্রেজা দুঃখে কাঁদতেন। পুরাণে বলা হয়েছে, তার অশ্রুবিন্দু স্বর্ণে পরিণত হতো। এই কাহিনি ফ্রেজার সঙ্গে স্বর্ণ ও সম্পদের সম্পর্ককেও বোঝায়। তার বিখ্যাত ব্রিসিঙ্গামেন হারও তার সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।ফ্রেজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল জাদুবিদ্যার সঙ্গে তার সম্পর্ক। নর্স ঐতিহ্যে ‘সেইদর’ নামে এক ধরনের জাদুবিদ্যা ও ভবিষ্যৎজ্ঞান প্রচলিত ছিল এবং ফ্রেজার সঙ্গে এই বিদ্যার বিশেষ সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। কিছু ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি এই জ্ঞান অন্য দেবতাদের মধ্যেও প্রচার করেছিলেন। ফলে ফ্রেজা শুধু সৌন্দর্য ও প্রেমের প্রতীক নন; তিনি জ্ঞান, ভবিষ্যৎজ্ঞান ও রহস্যময় শক্তির সঙ্গেও যুক্ত।ফ্রেজার চরিত্র তাই নর্স পুরাণে অত্যন্ত বহুমাত্রিক। তিনি প্রেম ও বিবাহের দেবী, আবার যৌনতা ও উর্বরতার দেবীও। তিনি স্বর্ণ ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত, আবার যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত যোদ্ধাদের একাংশের অধিষ্ঠাত্রী। তিনি প্রকৃতি, জ্ঞান ও জাদুবিদ্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ভনির দেবতাগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে তিনি প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় ধর্মীয় কল্পনায় নারী দেবত্বের একটি শক্তিশালী ও বহুমুখী রূপকে প্রকাশ করেন।