লোকির বিষোদ্‌গার ও দেবসভায় অশান্তির কাব্য

লোকাসেনা: লোকির বিষোদ্‌গার ও দেবসভায় অশান্তির কাব্যউত্তর ইউরোপের প্রাচীন নর্স পুরাণের জগৎ এক আশ্চর্য বৈপরীত্যে নির্মিত। সেখানে দেবতারা যেমন মহাশক্তির অধিকারী, তেমনই তাঁরা ঈর্ষা, ক্রোধ, অহংকার, প্রেম, প্রতিহিংসা ও ভয়ের মতো মানবিক আবেগেরও অধীন। দেবতাদের এই মানবিক দুর্বলতাই নর্স পুরাণকে নিছক দেবকাহিনি না রেখে এক গভীর নাটকীয় সাহিত্যে পরিণত করেছে। সেই সাহিত্যের অন্যতম তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক এবং অস্বস্তিকর সৃষ্টি হল ‘লোকাসেনা’—অর্থাৎ ‘লোকির বিষোদ্‌গার’ কিংবা ‘লোকির কলহ’।‘লোকাসেনা’ প্রাচীন নর্স সাহিত্যের ইডিক কবিতাগুচ্ছের অন্তর্ভুক্ত। এই কবিতাগুচ্ছ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লিখিতভাবে সংকলিত হলেও তার অন্তর্ভুক্ত বহু কবিতার রচনাকাল তার বহু পূর্ববর্তী। এসব কবিতার অধিকাংশের প্রকৃত রচয়িতা আমাদের অজানা। ফলে ‘লোকাসেনা’র ক্ষেত্রেও কোনও নির্দিষ্ট কবির নাম উচ্চারণ করা যায় না। কিন্তু কবির নাম অজ্ঞাত হলেও তাঁর কাব্যিক কণ্ঠস্বর অত্যন্ত স্পষ্ট—তীক্ষ্ণ, বিদ্রূপাত্মক, নির্দয় এবং একই সঙ্গে নাটকীয়।কবিতাটির কেন্দ্রে রয়েছেন লোকি—নর্স পুরাণের সবচেয়ে জটিল চরিত্রগুলির একজন। তিনি সম্পূর্ণ দেবতা নন, আবার দেবতাদের জগতের বাইরেরও নন; তিনি কখনও দেবতাদের সহায়ক, কখনও তাঁদের বিপদের কারণ। তাঁর বুদ্ধি অসাধারণ, তাঁর বাকশক্তি তীক্ষ্ণ, তাঁর চরিত্র পরিবর্তনশীল। তিনি যেমন দেবতাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেন, তেমনই তাঁর ষড়যন্ত্র দেবতাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ‘লোকাসেনা’য় তাঁর এই বিদ্রোহী, ধ্বংসাত্মক এবং ব্যঙ্গাত্মক সত্তাটিই সবচেয়ে প্রবল হয়ে ওঠে।কবিতার সূচনা এক ভোজসভাকে কেন্দ্র করে। সমুদ্রের অধিপতি এজির—যাঁকে কখনও কখনও গাইমির নামেও চিহ্নিত করা হয়—নিজের প্রাসাদে দেবতাদের জন্য এক মহাভোজের আয়োজন করেছেন। নর্স দেবতাদের জগৎ আসগার্ডের নানা দেবতা ও দেবী সেখানে সমবেত হয়েছেন। ইসির ও ভনির—দুই দেবগোষ্ঠীর বহু সদস্যই উপস্থিত। সিফ, ব্রাগি, ইদুন, ট্যির, নিওর্দ্‌, স্কাদি, ফ্রাইর, ফ্রাইয়া, ভিডার এবং আরও বহু দেবতা ও দেবী সেই সভাকে পূর্ণ করে তুলেছেন। চারদিকে পানীয়, খাদ্য, হাসি এবং আনন্দের পরিবেশ।এটি নিছক একটি ভোজসভা নয়। এজিরের গৃহে এই সমাবেশ যেন দেবতাদের মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক প্রতীক। এখানে অতিথির প্রতি সম্মান দেখানো হবে, ভোজের নিয়ম মানা হবে, এবং পুরনো বিরোধকে সাময়িকভাবে দূরে রাখা হবে—এটাই প্রত্যাশিত। দেবতাদের শক্তির পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক আচরণেরও কিছু অলিখিত বিধি রয়েছে। অতিথিকে অপমান করা, গৃহকর্তার শান্তি নষ্ট করা কিংবা সভায় অকারণে বিবাদ সৃষ্টি করা সেই বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।কিন্তু শান্তির এই পরিবেশের মধ্যেই ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে থাকে অশান্তির ছায়া।লোকি সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন না।আর সেই অনাহূত অতিথিই শেষ পর্যন্ত সমগ্র ভোজসভাকে পরিণত করবেন এক তীব্র বাক্‌যুদ্ধের মঞ্চে।এজিরের দুই বিশ্বস্ত ভৃত্য ফিমাফেং ও এলডির অতিথিদের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে অতিথিদের পানীয় ও খাদ্য পরিবেশন করছিলেন। কিন্তু ফিমাফেং-এর দক্ষতা এবং অতিথিদের কাছ থেকে পাওয়া প্রশংসা লোকির মনে ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কেন অন্য কেউ প্রশংসিত হবে? কেন অন্য কেউ দেবতাদের মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠবে?লোকির চরিত্রে ঈর্ষা কখনও নিছক আবেগ নয়; তা দ্রুত রূপ নেয় কর্মে। ক্রোধের বশে সে ফিমাফেংকে হত্যা করে।এই হত্যাকাণ্ডে ভোজসভায় উপস্থিত দেবতারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা লোকিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন। কিন্তু লোকিকে সরিয়ে দেওয়া মানেই বিপদ দূর করা নয়। বরং সে যেন অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আরও ভয়ংকর হয়ে ফিরে আসে।কিছুক্ষণ পর সে আবার ফিরে আসে। এবার তার মুখোমুখি হয় এজিরের অন্য ভৃত্য এলডির। লোকি তাকে থামিয়ে জানতে চায়—ভেতরে দেবতারা কী নিয়ে আলোচনা করছেন?এলডির জানায়, দেবতারা নিজেদের অস্ত্র ও শক্তির কথা বলছেন। কিন্তু সে একই সঙ্গে লোকিকে স্মরণ করিয়ে দেয়—এই সভায় তার কোনও স্থান নেই।এই উত্তর লোকির অহংকারে আঘাত করে। সে এলডিরকে অপমান করে, হুমকি দেয় এবং তাকে বাধ্য করে নিজের পথ ছেড়ে দিতে। তারপর কোনও অনুমতির তোয়াক্কা না করে সে আবার প্রবেশ করে এজিরের ভোজসভায়।লোকির প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে যেন সমস্ত শব্দ থেমে যায়।কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসি ও কথাবার্তায় মুখর ছিল দেবসভা, সেখানে হঠাৎ নেমে আসে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। দেবতারা জানেন, লোকি যখন আসে তখন তার সঙ্গে সাধারণত শান্তি আসে না। তার হাতে অস্ত্র নেই, কিন্তু তার জিহ্বাই তার অস্ত্র। আর সেই অস্ত্রের আঘাত কখনও তরবারির আঘাতের চেয়ে কম ভয়ংকর নয়।লোকি কিন্তু নিজের আচরণকে অন্যায় বলে মনে করে না। সে অতিথি-অভ্যর্থনার প্রাচীন নিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সে বলে, যদি সে এই ভোজসভায় এসেছে, তবে তারও একটি আসন এবং পানপাত্র পাওয়ার অধিকার রয়েছে।দেবতা ব্রাগি প্রতিবাদ করেন। তিনি জানান, লোকি অনাহূত; তাকে এই সভায় স্বাগত জানানো হয়নি।এখানেই লোকি তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি ব্যবহার করে—পুরনো শপথ ও সামাজিক নিয়মের স্মৃতি।লোকি ওডিনকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বহু পূর্বে দেবতাদের মধ্যে এমন এক শপথ ছিল যার ভিত্তিতে একই পাত্র থেকে পান করা ব্যক্তিকে সহজে ভোজসভা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। সেই শপথের মর্যাদা রক্ষা করতে ওডিন বাধ্য হন লোকির জন্য আসন দেওয়ার নির্দেশ দিতে।ওডিনের পুত্র ভিডার উঠে লোকির জন্য আসন করে দেয় এবং তার হাতে পানপাত্র তুলে দেয়।লোকি জয়ী হয়েছে—অন্তত প্রথম পর্বে।কিন্তু তার উদ্দেশ্য পান করা নয়; তার উদ্দেশ্য অপমান করা। তার উদ্দেশ্য এই শান্ত ভোজসভাকে এমন এক আয়নায় পরিণত করা, যেখানে দেবতাদের গৌরবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুর্বলতা, কামনা, প্রতারণা, ভয় এবং অতীতের কলঙ্ক প্রতিফলিত হবে।সে পানপাত্র হাতে তুলে প্রথমে উপস্থিত দেবতাদের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানায়। কিন্তু সেই শুভেচ্ছার মধ্যেই সে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রাগিকে আলাদা করে দেয়। যেন সবাই সম্মানের যোগ্য, কেবল ব্রাগি নন।ব্রাগি এতে অপমানিত হন। কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে ক্রোধে ফেটে পড়েন না। বরং লোকির সঙ্গে বিরোধ মেটানোর জন্য উপহার দেওয়ার প্রস্তাব করেন। একটি উৎকৃষ্ট অশ্ব, একটি মূল্যবান অঙ্গুরীয় এবং একটি তরবারি—এসব দিয়ে তিনি লোকির ক্রোধ প্রশমিত করতে চান।কিন্তু লোকি শান্তি চায় না।সে ব্রাগির সাহস নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সে জানতে চায়, ব্রাগি কি সত্যিই যোদ্ধা, নাকি কেবল কথার কবি?ব্রাগি বুঝতে পারেন যে লোকির উদ্দেশ্য তাঁকে উত্তেজিত করা। তাই তিনি জানান, এজিরের গৃহে যুদ্ধ করা গৃহকর্তার প্রতি অসম্মান। এখানে তরবারি নয়, সৌজন্যই নিয়ম। তবে আসগার্ডে ফিরে গেলে প্রয়োজনে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।এই সংযম লোকির উদ্দেশ্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। সে এমন একজন প্রতিপক্ষকে খুঁজছে যে তার সঙ্গে ক্রোধে জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ব্রাগি সেই সুযোগ না দেওয়ায় লোকি আক্রমণের লক্ষ্য বদলে দেয়।এবার তার লক্ষ্য ব্রাগির স্ত্রী ইদুন।ইদুন স্বামীকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, সন্তানসম বন্ধন, পুরনো সম্পর্ক এবং দেবসভায় উপস্থিতির মর্যাদা স্মরণ করে ব্রাগি যেন লোকির কটু কথার উত্তর না দেন।কিন্তু লোকির কাছে কোনও সম্পর্কই পবিত্র নয়।সে ইদুনকেও আক্রমণ করে। তার বিরুদ্ধে চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটায় এবং এমন একটি অতীত সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, যা তাঁর মর্যাদাকে কলঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। লোকির এই আক্রমণ কেবল ব্যক্তিগত অপমান নয়; এটি দেবসভায় প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মর্যাদার ওপরও আঘাত।এরপর একে একে অন্য দেবতারা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।কিন্তু লোকির কাছে প্রত্যেকটি প্রতিরোধই নতুন আক্রমণের সুযোগ।দেবী গেফিউন যখন বিবাদ থামানোর জন্য এগিয়ে আসেন, লোকি তাঁর দিকেও কটাক্ষ ছুড়ে দেয়। তাঁর সৌন্দর্য, প্রেম এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঘিরে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে সে তাঁকে অপমান করে। দেবসভায় একে একে যে নারীরা শান্তি ফিরিয়ে আনতে চান, তাঁদের প্রত্যেককেই লোকি এমনভাবে আক্রমণ করে যে তাঁর কথার মধ্যে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ এবং যৌন কটাক্ষ মিলেমিশে যায়।এখানে ‘লোকাসেনা’র একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। লোকি শুধু কারও একটি কাজের সমালোচনা করছে না; সে প্রত্যেক দেবতার সামাজিক পরিচয়, নৈতিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত ইতিহাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।এই পর্যায়ে দেবসভা আর ভোজসভা নেই। সেটি হয়ে উঠেছে বিচারসভা—কিন্তু বিচারক নেই, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী একই ব্যক্তি।এরপর ওডিন নিজেই পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে আসেন।ওডিন নর্স পুরাণের সর্বোচ্চ মর্যাদার দেবতাদের একজন—জ্ঞান, যুদ্ধ, কবিতা ও রহস্যের অধিপতি। কিন্তু লোকি তাঁর প্রতিও কোনও শ্রদ্ধা দেখায় না। বরং ওডিনের অতীতের নানা ঘটনা, তাঁর আচরণ এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অস্বস্তিকর দিকগুলি তুলে ধরে ব্যঙ্গ করে।লোকির এই সাহসের মধ্যে এক ধরনের বিপজ্জনক সমতা রয়েছে। সে রাজা ও সাধারণ, পুরুষ ও নারী, যোদ্ধা ও কবি—কাউকেই ছাড়ে না। তার কাছে দেবত্ব কোনও ঢাল নয়।ওডিনের স্ত্রী ফ্রিগও শেষ পর্যন্ত কথার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু তিনিও লোকির বিষাক্ত বাক্য থেকে রেহাই পান না। লোকি অতীতের নানা গোপন ঘটনা ও সম্পর্কের ইঙ্গিত তুলে তাঁর মর্যাদাকে আঘাত করার চেষ্টা করে।এখানে কবিতাটি ক্রমশ একটি গভীরতর নাটকীয় রূপ গ্রহণ করে। লোকি যেন একে একে দেবতাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছে। যে দেবতারা বাইরে থেকে সর্বশক্তিমান, পবিত্র এবং মহিমান্বিত—লোকির কথায় তাঁদের প্রত্যেকেরই কোনও না কোনও দুর্বলতা আছে।ফ্রাইয়া এগিয়ে এলে লোকি তাঁর সৌন্দর্য, প্রেম এবং বহু পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তাঁকে অপমান করে। দেবী হলেও তিনি লোকির চোখে নিরাপদ নন।ফ্রাইয়ার পিতা নিওর্দ্‌র প্রতিবাদ করেন। কিন্তু লোকি এবার তাঁর অতীত ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে কটাক্ষ করে। ভনির সঙ্গে ইসিরদের পুরনো সম্পর্ক, দেবতাদের পারস্পরিক বিবাহ ও রক্তসম্পর্ক—সবকিছুকেই সে বিদ্রূপের উপাদানে পরিণত করে।ট্যিরের সঙ্গে তার বাক্যযুদ্ধও কম তীব্র নয়। ট্যির সাহসী যোদ্ধা; কিন্তু লোকি তাঁর অতীতের এমন একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে, যা তাঁর শারীরিক অক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ লোকির কাছে কোনও দুর্বলতা এত ক্ষুদ্র নয় যে তা নিয়ে প্রকাশ্যে উপহাস করা যাবে না।ফ্রাইরও তার আক্রমণ থেকে রেহাই পান না। দেবতাদের প্রত্যেকেরই যেন লোকির কাছে একটি হিসাব রয়েছে।এমনকি যারা সরাসরি তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, তাদেরও সে কথার আঘাতে টেনে আনে।এখানে লোকির চরিত্রের একটি বিশেষ দিক প্রকাশ পায়—সে সত্য ও মিথ্যাকে এমনভাবে মিশিয়ে দেয় যে তার বক্তব্যের নৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সে যে অভিযোগগুলি করে তার কিছু হয়তো সম্পূর্ণ বিদ্বেষপ্রসূত, কিছু হয়তো পুরাণের পুরনো কাহিনির ইঙ্গিত বহন করে, আবার কিছু হয়তো অর্ধসত্য। কিন্তু তার লক্ষ্য সত্য প্রতিষ্ঠা নয়। তার লক্ষ্য হল প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলা।সে জানে, মানুষের—এবং দেবতাদের—সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের নিজেদের সম্মান।তাই সে অস্ত্রের বদলে সম্মানকে আঘাত করে।দেবতাদের মধ্যে কেউ তাকে যুক্তি দিয়ে থামাতে পারে না। কারণ লোকি কোনও নিয়ম মানছে না। সে সভার নৈতিক কাঠামোর ভেতর থেকে কথা বলছে না; বরং সেই কাঠামোটিকেই বিদ্রূপ করছে।কিন্তু এই অবিরাম বিষোদ্‌গারেরও এক সীমা আছে।ভোজসভায় তখনও অনুপস্থিত ছিলেন থর।থর নর্স পুরাণের বজ্রদেবতা, শক্তি ও যুদ্ধের প্রতীক। তাঁর হাতে রয়েছে বিখ্যাত হাতুড়ি মিয়োলনির। দেবতাদের মধ্যে তিনি লোকির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। লোকির অস্ত্র বুদ্ধি ও বাক্য; থরের অস্ত্র শক্তি ও হাতুড়ি।অবশেষে থর যখন ভোজসভায় এসে উপস্থিত হন, তখন পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়।লোকি তখনও কথা বলে চলেছে। একের পর এক দেবতাকে অপমান করে সে যেন নিজের বিজয়ে উল্লসিত। কিন্তু থরের সামনে এসে তার আত্মবিশ্বাসে প্রথমবারের মতো ফাটল দেখা দেয়।থর তাকে সতর্ক করেন—আর একটি শব্দও নয়।লোকি জানে, থরের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে জয়ী হওয়া গেলেও বাস্তব শক্তির লড়াইয়ে সে টিকতে পারবে না। থরের হাতুড়ি কেবল প্রতীক নয়; সেটি বাস্তব ধ্বংসের অস্ত্র।থর তাকে হুমকি দেন—সে যদি অবিলম্বে তার বিষোদ্‌গার বন্ধ না করে, তবে মিয়োলনিরের আঘাতে তার মাথা চূর্ণ হবে।এবার লোকি থামে।যে ব্যক্তি এতক্ষণ দেবতাদের প্রত্যেককে অপমান করেছে, যে ওডিন, ফ্রিগ, ফ্রাইয়া, নিওর্দ্‌, ট্যির, ব্রাগি—কারও মর্যাদাকে রেহাই দেয়নি, সেই লোকিই থরের শক্তির সামনে পিছিয়ে যায়।কিন্তু তার পশ্চাদপসরণও সম্পূর্ণ পরাজয় নয়। সে জানে, আজকের ভোজসভায় সে যে অশান্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তা সে সফলভাবেই করেছে। দেবতাদের সম্মিলিত গৌরবের আড়ালে যে বিরোধ, ঈর্ষা, কামনা, অহংকার ও দুর্বলতা রয়েছে, সে সেগুলিকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।তারপর সে ভোজসভা ত্যাগ করে পালিয়ে যায়।‘লোকাসেনা’র এই সমাপ্তি তাই কেবল একটি ঝগড়ার সমাপ্তি নয়। এটি এক ধরনের নাটকীয় প্রকাশের সমাপ্তি। লোকি যেন দেবতাদের সামনে একটি আয়না ধরেছিল, আর সেই আয়নায় তাঁরা নিজেদের এমন এক মুখ দেখতে বাধ্য হয়েছিলেন যা তাঁরা অন্যের সামনে প্রকাশ করতে চান না।এই কারণেই ‘লোকাসেনা’ নর্স পুরাণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এর গুরুত্ব কেবল দেবতাদের নিয়ে গল্প বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই কবিতার মাধ্যমে আমরা প্রাচীন নর্স সমাজের সম্মানবোধ, অতিথি-অভ্যর্থনার রীতি, দেবতাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক নিয়ম, যৌন নৈতিকতা, বীরত্বের ধারণা এবং দেবতাদের সম্পর্কে প্রচলিত নানা কাহিনির আভাস পাই।কবিতাটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তার ছন্দ। সমগ্র রচনাটি প্রাচীন নর্স অ্যালিটারেটিভ বা অনুপ্রাসনির্ভর ছন্দে নির্মিত। শব্দের পুনরাবৃত্তি, ধ্বনির সংঘাত এবং তীক্ষ্ণ সংলাপ কবিতাটিকে এক ধরনের মৌখিক নাট্যরূপ দিয়েছে। মনে হয় যেন কোনও প্রাচীন সভায় কবি দাঁড়িয়ে একে একে দেবতাদের চরিত্রের পর্দা সরিয়ে দিচ্ছেন।লোকি এখানে নিছক খলনায়কও নন, আবার নায়কও নন।তিনি একজন ট্রিকস্টার—চতুর, অনিয়ন্ত্রিত, বিধ্বংসী এবং সৃজনশীল। তিনি যে নিয়ম ভাঙেন, সেই নিয়মের অস্তিত্বই তাঁর বক্তব্যকে অর্থবহ করে তোলে। তিনি দেবতাদের শত্রু নন, কারণ তিনি তাদের জগতেরই অংশ। কিন্তু তিনি তাদের আনুগত্যও স্বীকার করেন না। তিনি দেবতাদের সঙ্গে থাকেন, আবার তাদের বিরুদ্ধেও দাঁড়ান।এই দ্বৈত অবস্থানই লোকিকে নর্স পুরাণের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্রে পরিণত করেছে।‘লোকাসেনা’য় তাঁর বিষোদ্‌গারের সবচেয়ে বড় শক্তি এই যে, তিনি দেবতাদের পবিত্রতার ধারণাকে প্রশ্ন করেন। দেবতা মানেই নিষ্কলঙ্ক—এই ধারণা তিনি গ্রহণ করেন না। তাঁর কথায় দেবতারা যেমন শক্তিশালী, তেমনই দুর্বল; যেমন মহান, তেমনই ঈর্ষাপরায়ণ; যেমন ন্যায়ের রক্ষক, তেমনই নিজেদের স্বার্থে নিয়ম ভঙ্গ করতে সক্ষম।এই অর্থে ‘লোকাসেনা’ কেবল দেবতাদের বিরুদ্ধে লোকির বিদ্রোহ নয়; এটি ক্ষমতা ও মর্যাদার বিরুদ্ধে ভাষার বিদ্রোহও।একটি তরবারি শরীরকে আহত করতে পারে, কিন্তু একটি তীক্ষ্ণ বাক্য মানুষের সম্মানকে আহত করতে পারে। লোকি সেই দ্বিতীয় অস্ত্রটির অধিপতি। সে জানে কোথায় আঘাত করলে দেবতার অহংকার ভেঙে পড়বে। তার প্রতিটি বাক্য যেন একটি করে তীর।কিন্তু শেষ পর্যন্ত থরের আগমন আমাদের আর একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়—বাক্যেরও সীমা আছে। বুদ্ধি ও ব্যঙ্গ যতই তীক্ষ্ণ হোক, শারীরিক শক্তির সামনে তা সবসময় টিকে থাকতে পারে না।তবু লোকির পরাজয় সম্পূর্ণ নয়। কারণ থর তাকে ভোজসভা থেকে সরিয়ে দিতে পারলেও, তার উচ্চারিত কথাগুলিকে মুছে দিতে পারেন না। সে যে প্রশ্নগুলি তুলেছে, যে গোপন স্মৃতিগুলি উন্মোচন করেছে, যে দেবতাদের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে—সেগুলি ভোজসভায় থেকে যায়।এই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও ‘লোকাসেনা’ পাঠযোগ্য।এটি শুধু প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় দেবতাদের একটি গল্প নয়। এটি ক্ষমতার সামনে ভাষার শক্তির গল্প। এটি সামাজিক সম্মানের ভঙ্গুরতার গল্প। এটি এমন এক বিদ্রোহীর গল্প, যে জানে তার হাতে সামরিক শক্তি নেই, কিন্তু তার জিহ্বা এমন ধারালো যে সে দেবতাদেরও আহত করতে পারে।আর সেই কারণেই এজিরের শান্তির জন্য নির্মিত ভোজসভা শেষ পর্যন্ত শান্তির স্থান থাকে না। এক অনাহূত অতিথির আগমন তাকে পরিণত করে অভিযোগ, অপমান, স্মৃতি, কুৎসা, আত্মরক্ষা ও প্রতিশোধের এক বিস্ময়কর নাট্যমঞ্চে।লোকি চলে যায়, কিন্তু তার বিষোদ্‌গার থেকে যায়।দেবতারা আবার হয়তো ভোজে বসবেন, পান করবেন, হাসবেন, নিজেদের মহিমার কথা বলবেন। কিন্তু একবার যখন লোকি তাঁদের মুখোশের আড়ালের মুখ দেখিয়ে দিয়েছে, তখন সেই মুখ আর সম্পূর্ণভাবে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।এইখানেই ‘লোকাসেনা’র সাহিত্যিক শক্তি।এটি দেবতাদের মহিমার কাব্য নয়; এটি দেবতাদের দুর্বলতার কাব্য।এটি শান্তির স্তব নয়; শান্তির ভেতরে জমে থাকা সংঘাতের উন্মোচন।এটি নায়কের বিজয়ের গল্প নয়; বরং এমন এক বিদ্রোহী কণ্ঠের গল্প, যে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে গেলেও তার উচ্চারিত শব্দগুলিকে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না।প্রাচীন নর্স কবিতার অন্ধকার, রুক্ষ এবং তীক্ষ্ণ জগতে তাই ‘লোকাসেনা’ এক অনন্য সৃষ্টি। এখানে দেবতারা স্বর্গীয় দূরত্ব হারিয়ে মানুষের খুব কাছে এসে দাঁড়ান। তাঁদের হাসি আছে, ক্রোধ আছে, প্রেম আছে, কামনা আছে, ঈর্ষা আছে, অপমানের ভয় আছে। আর তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে লোকি—এক হাতে পানপাত্র, অন্য হাতে অদৃশ্য একটি আয়না।সে সেই আয়নাটি একে একে সবার সামনে ধরে।তারপর থরের হাতুড়ির ভয়ে সরে যায়।কিন্তু আয়নাটি মাটিতে পড়ে ভাঙে না।তার ভেতরে দেবতাদের মুখগুলো থেকে যায়।আর সেই মুখগুলিই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ‘লোকাসেনা’র পঙ্‌ক্তির মধ্যে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *